দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েই প্রথাগত ভিভিআইপি সংস্কৃতির খোলনলচে বদলে দিচ্ছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ নাগরিকের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলাচল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত দাপ্তরিক ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এক নতুন ‘সাদামাটা’ কিন্তু ‘গতিশীল’ শাসন আমলের সূচনা করেছেন তিনি।
সড়কে নাগরিকের সমান্তরালে সরকারপ্রধান
রাজধানীর রাজপথে এখন আর আগের মতো সাইরেন বাজিয়ে দীর্ঘ প্রটোকলের দাপট নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন তার চলাচলের সময় রাস্তা বন্ধ না রাখার। ফলে দেখা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—সিগন্যালে বাসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি। এতে করে রাজপথে তৈরি হচ্ছে না কৃত্রিম যানজট, সাশ্রয় হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ট্রাফিক পয়েন্টে জটে আটকে থাকার সময় যখন সাধারণ পথচারীরা প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পাচ্ছেন, তারা বিস্ময় ও আনন্দ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীও জানালার কাঁচ নামিয়ে মৃদু হাসিতে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন তাদের সঙ্গে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি শিথিল করে জনগণের এত কাছে আসার এই ঘটনা রাজধানীর মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
সময়ানুবর্তিতা ও পুরোনোদের প্রতি মমতা
প্রধানমন্ত্রী কেবল সড়কেই নয়, অফিস ব্যবস্থাপনায়ও চমক দেখাচ্ছেন। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যালয়ে পৌঁছে গিয়ে তিনি চমকে দিচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সময়ানুবর্তিতার এই কঠোর বার্তা সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
একই সঙ্গে তার মানবিক দিকটিও আলোচনায় উঠে এসেছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তার মা বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত স্টাফ ও পুরোনো সহকর্মীদের খোঁজ নিচ্ছেন। ব্যক্তিগত শোক ও সংগ্রামের দিনগুলোতে যারা পাশে ছিলেন, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও তাদের ভুলে না যাওয়ার এই বৈশিষ্ট্যকে অনেকে তার ‘সাদামাটা’ জীবনেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘রকেট গতি’
ভোটের মাঠে জনগণকে দেওয়া ওয়াদাগুলো যেন কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য প্রথম দিন থেকেই ‘রকেট গতিতে’ কাজ করছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তার এই নিরন্তর ছুটে চলার কিছু মূল দিক হলো:
অনির্ধারিত বৈঠক: রুটিন মাফিক ক্যাবিনেট মিটিংয়ের বাইরেও তিনি গভীর রাত পর্যন্ত জরুরি ও অনির্ধারিত বৈঠক করছেন।
তাৎক্ষণিক তদারকি: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ কতটুকু এগোলো, তা সরাসরি তদারকি করছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার: রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত নিয়মিত অফিস করে ফাইল নিষ্পত্তি করছেন তিনি, যাতে প্রশাসনিক কাজে কোনো দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়।
জবাবদিহিতা: নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের এই প্রটোকলমুক্ত চলাফেরা কেবল একটি প্রতীকী ঘটনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশল। যখন একজন সরকারপ্রধান নিজেই ট্রাফিক জটে বসে থাকেন, তখন জনভোগান্তির প্রকৃত রূপটি তিনি উপলব্ধি করতে পারেন—যা নীতিনির্ধারণে সহায়ক হয়।
তবে এই ‘সাদামাটা’ যাপন এবং ‘রকেট গতি’ কতদিন বজায় থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যদি এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়, তবে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হবে।

