অর্থনীতির পালে হাওয়া: ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল রিজার্ভ


অর্থনীতির পালে হাওয়া: ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল রিজার্ভ

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। টানা কয়েক মাস ধরে ডলার সংকটে ভোগার পর এবার বড় সুখবর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৪ হাজার ৮৬২ দশমিক ০২ মিলিয়ন বা ৩৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


সংকট কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে ডলার

বৈশ্বিক অস্থিরতা আর আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে এক সময় রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই শিথিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমাদের মোট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করলে এই চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন।

আইএমএফের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল’ (বিপিএম-৬) পদ্ধতি অনুসরণ করে বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ হাজার ১০৭ দশমিক ৮২ মিলিয়ন বা ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাধারণত আইএমএফের এই হিসাব পদ্ধতিকেই আন্তর্জাতিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ মনে করা হয়, কারণ এতে রিজার্ভের ব্যবহারযোগ্য বা প্রকৃত অংশটি প্রতিফলিত হয়।

কেন বাড়ছে রিজার্ভ?

অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করেছে:

  • রেমিট্যান্সের উচ্চপ্রবাহ: বিদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ গত কয়েক মাসে আশাতীত হারে বেড়েছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারকে সবচেয়ে বেশি পুষ্ট করেছে।

  • রপ্তানি আয়ে গতি: তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতের রপ্তানি আয় বাড়তে শুরু করায় বৈদেশিক মুদ্রার অন্তপ্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে।

  • আমদানি নিয়ন্ত্রণ: অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ডলারের বহির্গমন কমেছে।

  • বিদেশী ঋণ ও সহায়তা: আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের কিস্তি ছাড় হওয়ার ফলে রিজার্ভের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।


একনজরে রিজার্ভের পরিসংখ্যান (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

হিসাবের ধরণপরিমাণ (মার্কিন ডলারে)
মোট (গ্রস) রিজার্ভ৩৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার
বিপিএম-৬ পদ্ধতি (আইএমএফ)৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার
তথ্য প্রকাশকারীআরিফ হোসেন খান (মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক)
রিজার্ভের প্রবৃদ্ধির হারগত সপ্তাহের তুলনায় ১.৩২% (প্রায়)

রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা অনেকাংশেই দূর হবে। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে যেন কার্ব মার্কেট বা খোলা বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান খুব বেশি না হয় এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকে।

৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক। এটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার এক নতুন বার্তা।