তরমুজ কেন এত লাল? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও কিছু চমকপ্রদ তথ্য!


তরমুজ কেন এত লাল? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও কিছু চমকপ্রদ তথ্য!

তপ্ত রোদে এক ফালি হিমশীতল লাল টকটকে তরমুজ যেন প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই ফলের ভেতরটা কেন এমন গাঢ় লাল রঙের হয়? মূলত ‘লাইকোপেন’ নামক এক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কারণেই তরমুজ তার আকর্ষণীয় লাল বর্ণ ধারণ করে, যা মানবদেহের জন্যও অত্যন্ত উপকারী।

রঙের নেপথ্যে থাকা কারিগর: লাইকোপেন

তরমুজের এই নজরকাড়া লাল রঙের পেছনে প্রধান কৃতিত্ব হলো লাইকোপেন (Lycopene) নামক এক ধরণের জৈব রঞ্জক বা ক্যারোটিনয়েড। এটি প্রাকৃতিকভাবেই নির্দিষ্ট কিছু ফল ও সবজিতে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, তরমুজে টমেটোর তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি লাইকোপেন থাকে। যখন তরমুজটি লতা থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বড় হতে থাকে, তখন সূর্যের আলো এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রভাবে এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, তরমুজ যত বেশি পাকে, তার ভেতরের লাইকোপেনের মাত্রা তত বাড়ে এবং রঙ তত গাঢ় লাল হতে থাকে। কাঁচা অবস্থায় তরমুজের ভেতরটা সাদা বা হালকা সবুজ থাকে কারণ তখন লাইকোপেন সংশ্লেষণ শুরু হয় না।

বিবর্তনের ধারা ও জাতের ভিন্নতা

একটা সময় ছিল যখন তরমুজ আজকের মতো এত লাল ছিল না। বুনো তরমুজ ছিল মূলত সাদাটে বা হালকা হলুদাভ এবং স্বাদে কিছুটা তিতা। হাজার বছর ধরে কৃষকদের নির্বাচনমূলক চাষাবাদ এবং আধুনিক উদ্ভিদ প্রজনন বিদ্যার কল্যাণে আমরা আজকের এই মিষ্টি ও টকটকে লাল তরমুজ পেয়েছি। তবে এখনো বাজারে হলুদ বা কমলা রঙের তরমুজ দেখা যায়। সেগুলোতে লাইকোপেনের পরিবর্তে ‘বিটা-ক্যারোটিন’ নামক অন্য এক ধরণের রঞ্জক থাকে, যা আমাদের শরীরের ভিটামিন-এ এর চাহিদা পূরণ করে।

তরমুজ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

তরমুজ শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, এর পুষ্টিগুণও অপরিসীম। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এর বিশেষ কিছু দিক:

  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: লাইকোপেন হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

  • পানির আধার: তরমুজের প্রায় ৯২ শতাংশই পানি, যা তীব্র গরমে শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে বাঁচায়।

  • সিট্রুলাইন: এতে থাকা ‘সিট্রুলাইন’ নামক অ্যামিনো অ্যাসিড রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং পেশীর ব্যথা উপশম করে।

  • কম ক্যালোরি: মিষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

লাল না হলে কি মিষ্টি হয় না?

ভোক্তাদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে, তরমুজ লাল না হলে তা মিষ্টি হবে না। এটি আংশিক সত্য। লাল রঙ পরিপক্কতার লক্ষণ, আর পরিপক্ক ফলে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে। তবে বর্তমানে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন কিছু জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা হলুদাভ হলেও স্বাদে অত্যন্ত মিষ্টি। তবুও বাঙালির কাছে চৈত্র-বৈশাখের দুপুরে কাঁচের গ্লাসে লাল তরমুজের শরবত বা প্লেটে সাজানো লাল ফালির আবেদন চিরন্তন।

তরমুজের এই লাল রঙ কেবল চোখের প্রশান্তি নয়, বরং এটি প্রকৃতির এক অনন্য দান যা আমাদের সুস্থ রাখতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কৃষি বিজ্ঞানীরা এখন এমন জাতের তরমুজ নিয়ে গবেষণা করছেন, যা আরও বেশি তাপ সহনশীল এবং অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হবে।