বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) আওতায় সেবাখাতে বড় ধরনের ছাড়ের ঘোষণা এসেছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ১২০টি সেবাখাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে জাপান, আর বিনিময়ে বাংলাদেশও তাদের ৯৮টি খাতে একই সুবিধা প্রদান করেছে। সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই যুগান্তকারী তথ্য জানানো হয়।
নতুন বিনিয়োগের হাতছানি
সোমবার দুপুরে সচিবালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, এই চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের পরিমাণই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের সেবাখাতে জাপানি প্রযুক্তির সন্নিবেশ ও সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে মূল ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, “জাপান আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী। ইপিএ-এর মাধ্যমে আমরা পণ্য বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এখন সেবা ও বিনিয়োগের নতুন স্তরে প্রবেশ করছি।”
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। এই সন্ধিক্ষণে জাপানের মতো একটি বড় অর্থনীতির সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বর্ম হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে সেবাখাতে ১২০টি ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় বাংলাদেশের আইটি বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও কেয়ারগিভার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সেবার জন্য জাপানি বাজার আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত হবে।
ইপিএ চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
চুক্তির বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই দেশই একে অপরের বাজার সম্প্রসারণে উদারতা দেখিয়েছে। জাপানের বাজারে বাংলাদেশের জন্য যে ১২০টি সেবাখাত উন্মুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), টেলিযোগাযোগ, নির্মাণ শিল্প এবং স্বাস্থ্যসেবা অন্যতম। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক খাত, লজিস্টিকস এবং উচ্চতর কারিগরি সেবার ৯৮টি খাত উন্মুক্ত করেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা শুধু বাজার উন্মুক্ত করিনি, বরং জাপানি মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের সেবার মানোন্নয়নের একটি সুযোগ পেয়েছি।” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। জাপানি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করেন। তাই সচিবালয়ের এই ঘোষণা বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সংস্কারও জরুরি।
এই চুক্তির ফলে জাপানি অটোমোবাইল জায়ান্ট এবং ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের সার্ভিস সেন্টার ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট স্থাপনে আরও উৎসাহিত হবে। এতে করে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানি প্রযুক্তির সরাসরি স্থানান্তর ঘটবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পাল্লা দিতে প্রস্তুত। ১২০টি খাতে জাপানি বাজারের সুবিধা গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবাখাতের অবদান বর্তমানের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন সময় সঠিকভাবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ সেবার ব্র্যান্ডিং মজবুত করা।
এক নজরে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো:
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সুবিধা: মোট ১২০টি সেবাখাতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা।
বাংলাদেশের বাজারে জাপানের সুবিধা: ৯৮টি নির্দিষ্ট সেবাখাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার।
প্রত্যাশিত প্রভাব: বিশেষ করে আইটি ফ্রিল্যান্সিং এবং পেশাদার জনশক্তি রপ্তানিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্র: অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং, ইলেকট্রনিক্স এবং লজিস্টিক সাপ্লাই চেইনে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা।

