মারণাস্ত্রের মহোৎসব: কার পকেটে যাচ্ছে যুদ্ধের মুনাফা?


মারণাস্ত্রের মহোৎসব: কার পকেটে যাচ্ছে যুদ্ধের মুনাফা?

কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা’। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে এই ‘অবহেলার’ সমীকরণটি ভিন্ন। এখানে এক পক্ষের রক্তপাত মানে অন্য পক্ষের বিপুল মুনাফা। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এসআইপিআরআই) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ১০টি দেশ সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারের ৮৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যার শীর্ষে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

বারুদের গন্ধে ভারী হচ্ছে অর্থনীতির পাল্লা

বিশ্বজুড়ে যখন শান্তির ললিতবাণী শোনানো হয়, পর্দার আড়ালে তখন চলে মারণাস্ত্র বিক্রির রমরমা আয়োজন। গত ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে ভূ-রাজনীতির যে মোড়লদের দেখেছি, তাদের ক্ষমতার মূল উৎস কেবল গণতন্ত্র বা আদর্শ নয়, বরং তাদের উন্নত যুদ্ধাস্ত্র। এসআইপিআরআই-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে যুদ্ধের প্রকৃতি বদলালেও অস্ত্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি। বরং গুটি কয়েক দেশের হাতেই কুক্ষিগত হয়ে আছে বিশ্বের সব ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি।

অস্ত্র বিক্রির এই অসম লড়াইয়ে অন্য দেশগুলো যেখানে সম্মিলিতভাবে মাত্র ১২ শতাংশ বাজার দখল করতে পেরেছে, সেখানে শীর্ষ ১০ দেশ বাকি ৮৮ শতাংশ নিজেদের কবজায় রেখেছে। এটি কেবল ব্যবসা নয়, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে এই দেশগুলো কেবল অর্থই উপার্জন করছে না, বরং আমদানিকারক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাটাইও নিজেদের হাতে রাখছে।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও বাকিদের লড়াই

অস্ত্র রপ্তানির দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র অন্য সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মার্কিন সামরিক শিল্প সংস্থাগুলো তাদের সরকারি নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে উত্তেজনার পারদ চড়ছে, অন্যদিকে মার্কিন অস্ত্র কারখানায় উৎপাদন বাড়ছে কয়েক গুণ। এফ-৩৫ ফাইটার জেট থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক মিসাইল সিস্টেম—সবকিছুই এখন মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, ফ্রান্স এবং রাশিয়াও এই দৌড়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া। বিশেষ করে ফ্রান্স সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের অত্যাধুনিক ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান দিয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের হিস্যা অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার রপ্তানি বাজারে কিছুটা ভাটা পড়লেও তারা এখনো শীর্ষ তালিকার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। চীনও নিঃশব্দে এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে তাদের সস্তা অথচ কার্যকরী অস্ত্রের বাজার বড় করে তুলছে।


বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্যের কিছু জরুরি তথ্য:

  • শীর্ষ আধিপত্য: বিশ্বের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৮৮ শতাংশই আসে মাত্র ১০টি দেশ থেকে।

  • মার্কিন রাজত্ব: বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।

  • আমদানিকারকের তালিকা: ভারত, সৌদি আরব এবং কাতার বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

  • প্রযুক্তির বদল: বর্তমানে প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন এবং সাইবার যুদ্ধের সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।


শান্তির আড়ালে এক দীর্ঘশ্বাস

যুদ্ধের ময়দানে যখন সাধারণ মানুষের আহাজারি শোনা যায়, তখন বড় দেশগুলোর শেয়ার বাজারে অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দর চড়চড় করে বাড়তে থাকে। নির্মলেন্দু গুণের কবিতার সেই অবহেলা আজ কেবল অস্ত্রের মাধ্যমেই প্রদর্শিত হচ্ছে না, বরং এটি একটি অমানবিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমেই বিশ্বকে শাসন করার প্রবণতা বজায় থাকবে, ততক্ষণ অস্ত্রের এই অশুভ প্রতিযোগিতা থামবে না।