সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ঢাকায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর অধিকাংশই বাসের কারণেই ঘটছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউট (এআরআই)। এবং তারা এও দাবি করছেন দুর্ঘটনাগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ বাস চালকদের বেপরোয়া গতিতে বাস চালনা।
রাজধানীতে বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় বাসের জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিধিনিষেধ অমান্য করে বাস চালনা।
গত মঙ্গলবার বাস চাপায় রাজধানীর নদ্দা এলাকায় আবরার আহমেদ চৌধুরী নামের এক ছাত্র নিহত হন। তিনি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ঘটনায় সুপ্রভাত পরিবহণ নামের একটি বাস কোম্পানি জড়িত রয়েছে এবং চালকের বেপরোয়া গতির জন্য অভিযোগ উঠেছে।
গত বছরের ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত বিচ্ছিন্ন হয় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজিব হোসেনের। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ এপ্রিল মারা যান তিনি।
একই বছরের, ২০ এপ্রিল রাতে বনানীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় বিআরটিসির একটি বাসের চাপায় ২১ বছর বয়সী রোজিনার ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ এপ্রিল মারা যান রোজিনা।
গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এ ঘটনার পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়ে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে তারা রাস্তায় নেমে আসে এবং ওই সময়ে রাজধানীর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে আসে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে। সবশেষে আন্দোলন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। এরপরও সড়কে থামেনি মৃত্যুর মিছিল। যার ফল বিশ্লেষণ করলে সাম্প্রতিক সময়ের দুর্ঘটনাই তার বাস্তব প্রমান।
গত ডিসেম্বরে গুলশানের শাহজাদপুরে বাসচাপায় স্কুলছাত্রী, বিজয় সরণীতে বাসের ধাক্কায় অটোরিকশা আরোহী তরুণ, অক্টোবরে দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়ে এক তরুণ, এরও আগে সেপ্টেম্বরে বাসের চাপায় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়।
বুয়েটের এআরআই বলছে, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় প্রায় ৭০০ জন নিহত এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই বাসের কারণে ঘটেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়াও ১৩০টি মোটরসাইকেল, ১১৩টি ট্রাক, ৭৩টি পিকআপ এবং ৫৬টি ব্যক্তিগত গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বলে এআরআইর জানিয়েছে।
তাদের মতে, এসময় রাজধানীতে ঘটা দুর্ঘটনা গুলোর অধিকাংশই বাসের কারণে ঘটেছে।
২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ১২৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন, আহত হয়েছেন ৩৩৭ জন।
২০১৭ সালে ঢাকায় ২৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে ২৭৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৩৫৮ জন আহত হয়েছিল। সে বছর প্রায় ১৪৫টি দুর্ঘটনায় বাসের সম্পৃক্ততা ছিল। বলে তথ্য দিচ্ছে এআরই।
২০১৮ সালে ঢাকায় ২৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬ জন নিহত হয়। আহত হয়েছিল ৫৩২ জন। সে বছর ১৩৪টি দুর্ঘটনার কারণও বাস।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণেই অধিকাংশ দুর্ঘটনায় বাসকেই দায়ী করছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় দুর্ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে বাসের পরই রয়েছে ট্রাক ও মোটর সাইকেল। বেশিরভাগ চালকদের মধ্যে যাত্রী নেওয়ার প্রতিযোগিতা ঢাকায় দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
“ঢাকার নানা কোম্পানির নামে চলাচলকারী বাসগুলো বিভিন্ন মালিকের। এজন্য তারা প্রতিযোগিতা করে। তারা একটি কোম্পানির নাম নিয়ে চলে। দৈনিক চুক্তিতে চলাচলের কারণে এগুলো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যে কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়।
আমাদের কাউন্টার সিস্টেম নাই,তার জন্য মালিকরা চালকদের সঙ্গে চুক্তিতে চলে গেছে। এ কারণে চালকরা বেশি আয়ের আশায় প্রতিযোগিতা করে।”
দুর্ঘটনার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে চালকের অদক্ষতার কথা বলেন তিনি।
“ঢাকা শহরে বেশিরভাগ চালকই পাকা লাইসেন্সধারী না, অনভিজ্ঞ। তারা লেগুনা, পিকআপসহ হালকা যানবাহনের চালক। ভারী লাইসেন্সধারী চালকরা ঢাকায় গাড়ি চালাতে আসে না। ফলে দক্ষ চালকের অভাবে মালিকরা তাদের (অদক্ষ) হাতে গাড়ি তুলে দিচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।
এ কারণে আমরা চুক্তিভিত্তিক চলাচল বন্ধের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কাউন্টার না থাকায় সেটি করা যায়নি। নানা চেষ্টা করেও এই প্রবণতা রোধ করা যায়নি বলে স্বীকার করেন এই পরিবহন ব্যবসায়ী। এখন বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু হলে এ সমস্যার সমাধান সম্বভ বলে জানান তিনি।

