সাকিব আহমেদের গল্প “কাব্যকথা”


bdnews24 bangla newspaper, bangladesh news 24, bangla newspaper prothom alo, bd news live, indian bangla newspaper, bd news live today, bbc bangla news, bangla breaking news 24, prosenjit bangla movie, jeeter bangla movie, songsar bangla movie, bengali full movie, bengali movies 2019, messi vs ronaldo, lionel messi stats, messi goals, messi net worth, messi height

রাত দুইটা। মেঘের গুড়গুড় শব্দ কানে আসছে। কখনো বিকট শব্দে বাজ পড়ছে। বুকের ভেতর বন্দি থাকা আত্মাটা একটু পর পর চমকে উঠছে। বজ্রপাতের শব্দে ঘুম আসছে না সীমার। একটু ভয় ভয়ও করছে। বজ্রপাতের শব্দকে বেশ ভয় লাগে তার।

এমন অবস্থায় কারো সাথে কথা বলতে পারলে হতো! কাকে ফোন দিবে সে? কাব্য ভাইয়াকে দিবে? ভাবল সীমা। পরক্ষণেই সে চিন্তা বাদ দিয়ে দিলো। এত রাতে ফোন দিলে কি ভাববে ভাইয়া! হয়ত সে ঘুমোচ্ছে। সাতপাঁচ ভেবে ফোনটা দিয়েই দিলো।

ওপাশে রিং হচ্ছে। এদিকে বুক দুরুদুরু করছে সীমার। যদি বকা দেয় কাব্য ভাইয়া? কাব্যর সাথে সীমার সম্পর্ক ছাত্রী-শিক্ষকের। শিক্ষক হলেও দুজনের সম্পর্ক ভাই-বোনের মতোই। বোনের মতো সীমাকে আদর করে কাব্য, খেয়াল রাখে। সমস্ত বিপদ আপদ, অসুবিধায় পাশে থাকে। এসব ভালো লাগে সীমার। ভাই হিসেবে কাব্যকে খুব সম্মানও করে।

সীমাকে কাব্য পড়ায় সেই ক্লাস নাইন থেকে। এখন কলেজে উঠেছে। সেই পড়ানো, আদর-ভালোবাসায় ছেদ পড়েনি। ঠিক একই রকমই আছে সবকিছু। বদলেছে কেবল সীমার গড়ন। আগের থেকে অনেক সুন্দরী হয়েছে। যেকোনো ছেলে তাকিয়ে থাকলে চোখ ফেরাতে পারেনা। চোখ ফেরাতে পারে না কাব্যও। বাধ্য হয়ে চোখ ফেরায়, কিন্তু বুকের ভেতর অন্যরকম অনুভূতি লুকাতে পারে না। সীমাকে দেখলে কেন এমন লাগে, বোঝেনা কাব্য। তবে কি?

ওপাশে এখনো রিং বাজছে। সীমার মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে বাজছে সেই রিং। এখনো ফোন ধরছে না কেন? নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে। ফোন কেটে দিবে ভাবল সীমা, এমন সময় ও-প্রান্ত থেকে ভেসে এলো কাব্যের কণ্ঠ।

‘এতো রাতে, সীমা?’ জিজ্ঞেস করল কাব্য। ‘কোনো সমস্যা?’

‘কিছু না, ভাইয়া।’ জবাব দিলো সীমা। ‘এমনিই ফোন দিলাম। ঘুমাচ্ছিলে?’

‘না,’ বলল কাব্য। ‘একটা কবিতা লিখছিলাম।’ কাব্যের কবিতা লেখার খুব শখ। মাঝে মাঝেই কবিতা লিখে সীমাকে শোনায়। বেশিরভাগ যদিও বস্তাপচা, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এক দুইটা ভালো কবিতা লিখে ফেলে। সীমার কবিতা খুব ভালো লাগে। মুগ্ধ হয়ে কাব্যর কবিতাগুলো শোনে। সব কবিতা শেষেই ভালো হয়েছে বলে উৎসাহ দেয়। তবে কাব্য জানে তার কবিতাগুলো ভালো হয় না। সীমা বলে কাব্য আর কবিতা…. নামের মিল বলেই কবিতাগুলো সুন্দর হয়। কাব্য হাসে, কিছু বলে না।

‘এত রাতে কবিতা?’ জিজ্ঞেস করল সীমা।

‘বৃষ্টির এমন রিমঝিম শব্দেই তো কবিতার ছন্দ সৃষ্টি হয়।’ হেসে জবাব দিলো কাব্য। ‘ঘুম আসছিল না, তাই ভাবলাম একটু কবিতা লেখার ট্রাই করি।’ তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু তুমি এত রাতে ফোন দিলে কেন, বললে না যে?’

‘তেমন কিছু না,’ বলল সীমা। ‘এত জোরে জোরে বাজে পড়ছে। ভয় লাগছিল। ঘুমও আসছে না। তাই ভাবলাম তোমাকে ফোন দেই।’

‘রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে? কাল কলেজ আছে না? এখন ঘুমোতে যাও। এত ভয় পেতে হবে না।’

‘ঠিক আছে, যাচ্ছি।’ বলল সীমা। ‘তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো। রাত জেগে কবিতা লিখতে হবে না। শরীর খারাপ করবে।’

‘হ্যাঁ, আমি ঘুমিয়ে যাবো।’

‘ঠিক আছে, ভাইয়া। বাই, গুড নাইট।’ বলে ফোন কেটে দিলো সীমা। মা মরা মেয়েটার জন্য মায়া হয় কাব্যর। সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে সীমা। এরপর চাচীর কাছে মানুষ। অনেক যত্ন করলেও চাচীর কাছে মেয়ে হয়ে উঠতে পারেনি। এই আক্ষেপটা সীমার অনেকদিনের। মাঝে মাঝেই দুঃখ করেই কথাগুলো বলে। সীমার এই দুঃখ মন ছুঁয়ে যায় কাব্যর। আরও বেশি কাছে যেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে সীমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে। সীমার কথা ভাবতে ভাবতে, আর বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে কাব্য ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও বলতে পারবে না।

পড়ুন : সাকিব আহমেদের গল্প “দস্যিপনা”

রাতে ঘুমোতে দেরি হয়েছে। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালের এই সময়টা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগে। ঘুমের মাঝেই কম্বল জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে কাব্য। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে যাচ্ছে। কিন্তু রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না। আরেকটু ঘুমাই, ভাবল কাব্য। পরে রিসিভ করা যাবে।

ফোন বাজতে বাজতে একসময় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পর আবার বাজছে। নাহ! এভাবে কি ঘুমিয়ে থাকা যায়? অনেকটা বিরক্তিভাব নিয়ে রিসিভ করল কাব্য।

‘হ্যালো,’ বলার সাথে সাথে ও প্রান্তে মেয়েলি কণ্ঠ। ‘এখনো ঘুমাচ্ছিস তুই?’ বলল কণ্ঠটা। ফোন রিসিভ করার সময় ঘুমের কারণে নাম দেখেনি কাব্য। কণ্ঠ শুনে ফোন হাতে নিয়ে দেখে লাবণী ফোন করেছে। লাবণী কাব্যর বেস্টফ্রেন্ড। ওরা একসাথে চলে, একসাথে থাকে। অনেকে বলে এমন জুটি সচরাচর দেখা যায় না। এ জুটি বন্ধুত্বের, এ জুটি একে অপরকে অনুপ্রাণিত করার। তাদের এই বন্ধুত্বকে অনেকেই হিংসার চোখে দেখে। সে কারণেই এমন সুন্দর, মধুর বন্ধুত্ব নিয়ে কুৎসা রটাতে কেউ দ্বিধা করে না।

‘হুম,’ লাবণীর প্রশ্নের বিপরীতে ঘুমজড়িত কণ্ঠে ছোট্ট জবাব দিল কাব্য।

‘কি, হুম?’ বলল লাবণী। ‘রাতে ঘুমাসনি?’

‘ঘুমাতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।’ কাব্য উত্তর দিলো।

‘কি করছিলি শুনি?’ বলল লাবণী। ‘নিশ্চয়ই তোর সেই জঘন্য কবিতাগুলো লিখছিলি।’

‘আমার কবিতাগুলো মোটেও জঘন্য নয়।’ ঘুম চলে গেছে কাব্যর। কাব্য নিজেও জানে তার কবিতাগুলো খুব বাজে হয়। শুধু সীমাই কবিতাগুলোর প্রশংসা করে। সেসব অবশ্য স্বীকার করে না কাব্য। এখন লাবণীকে বলল, ‘তুই কবিতা পছন্দ করিস না বলেই তোর কাছে জঘন্য মনে নয়।’

‘আমি সব কবিতা পছন্দ করি, তোরটা নয়।’ বলল লাবণী। কাব্যকে ক্ষেপাতে বেশ মজা পায় সে। কাব্য অবশ্য ক্ষেপে না। কখনো কখনো রেগে যাচ্ছে এমন অভিনয় করে। তাতে খুশি হয়ে আরও রাগায় লাবণী। লাবণীর এই হাসিখুশি মাখা মুখ দেখতে ভালো লাগে কাব্যর।

‘হয়েছে,’ বলল কাব্য। ‘সাত সকালে ঝগড়া করতে ফোন দিয়েছিস?’

‘না,’ জবাব দিলো লাবণী। ‘এক ঘন্টার মধ্যে তুই আমার সাথে দেখা করবি, সেটা বলতে।’

‘হঠাৎ এত জরুরি তলব? কিছু হয়েছে?’

‘কিছু হোক, বা না হোক। তোকে আসতে বলেছি, তুই আসবি।’ অগত্যা কি আর করার। প্রিয় ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে উঠে পড়তে হলো কাব্যকে।

 

ঠিক এক ঘণ্টা পর লাবণীর সামনে বসে আছে কাব্য। হঠাৎ করে কেন এভাবে ডেকেছে, কিছুই বলছে না লাবণী। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে ঝালমুড়ি চিবুচ্ছে লাবণী। মুখে কোনো কথা নাই। চুপ করে চেয়ে আছে সামনের দিকে।

‘কাল রাতে সীমা ফোন দিয়েছিল।’ নীরবতা ভাঙল কাব্য।

‘ও, ওই বদ মেয়েটা ফোন দিয়েছিল আবার!’ কাব্যর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল লাবণী। ‘এত রাতে কি চায় তোর কাছে?’

‘কিছু চায় না। কাল ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। ভয় পাচ্ছিল ও। তাই ফোন দিয়েছিল।’

‘ভয় পেলে পাবে। তুই কেন ওর ভয় দূর করার দায়িত্ব নিবি? কাব্যর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল লাবণী।

এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না কাব্য। লাবণীকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওর নাম নিলে তুই কেন এমন করিস? ওর উপর এত বিরক্ত কেন তুই?’

‘কারণ তুই আমার একটা কথাও শুনিস না।’ নির্লিপ্তভাবে বলল লাবণী।

লাবণীর এ কথায় চুপ হয়ে গেল কাব্য। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাব্য অনেকের কাছেই শুনেছে লাবণী তাকে পছন্দ করে, ভালোবাসে। কাব্য সে বিষয় বুঝে না। বুঝে না লাবণীর মনের কথা। ভালোবাসে বলেই কাব্যের প্রতি অনেক কেয়ারিং লাবণী। এই কথাগুলো লোকমুখে অনেক শুনলেও হেসে উড়িয়ে দেয় কাব্য। কারণ সে লাবণীকে চেনে, জানে এবং বুঝে। লাবণী তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে, কিন্তু সেটা যে শুধু মাত্র বন্ধু হিসেবেই তা না বোঝার মতো অবুঝ নয় কাব্য। কারণ, লাবণী প্রায়ই সীমার সাথে রিলেশনের কথা বলে কাব্যকে। বলে এখনও সময় আছে, মনের কথা বলে দেওয়ার।

কাব্য কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। সে কি সীমাকে সত্যিই ভালোবাসে? সীমার প্রতি তার দুর্বলতা যে নেই, তা নয়। কিন্তু তা কি ভালোবাসা? নাকি সীমার প্রতি মমতা? এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। হয়ত লাবণীই ঠিক। মনের মাঝে জমে থাকা মমতা ভালোবাসার রূপ নিয়েছে, কাব্য বুঝেনি।

 

মাগরিবের আজান দিচ্ছে দূরের কোনো মসজিদে। একটু পরেই সীমাকে পড়াতে যেতে হবে। আজ কেন যেন বুকটা দুরুদুরু করছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। বাজ পড়ছে বিকট শব্দে। তৈরি হয়ে নিজের পুরনো ছাতা নিয়ে বের হলো কাব্য। ছাতা হাতে নিয়ে হাঁটতে বিরক্ত লাগে তার। এরচেয়ে বৃষ্টিতে ভেজা ঢের ভালো। কিন্তু এখন যে ছাতা নিতেই হবে। বৃষ্টিতে ভিজতে দেখলে সীমা বকা দেয়, শাসন করে। সীমার এই মেকি শাসনগুলো কাব্যর প্রচণ্ড ভালো লাগে। তবে এখন সেই বকা খাওয়ার ইচ্ছা নেই বলেই ছাতা নিয়ে বের হলো।

এক দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়ছে। একটু একটু করে তেজ বাড়ছে বৃষ্টির। যেকোনো সময় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। দ্রুত পা চালালো কাব্য। মনে হচ্ছে সারা রাত ধরে বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমে যায়, এই একটা অসুবিধা। এছাড়া বৃষ্টি ভালো লাগে কাব্যর।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছাতাটা বন্ধ করল। বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে। কিছু মুহূর্ত পর দরজা খুলল, সীমা দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। আজ সীমাকে অপূর্ব লাগছে। নীল সালোয়ার কামিজে বড্ড বেশি সুন্দর লাগছে। বোধহয় একটু আগে গোসল করেছে। চুলগুলো ভেজা। তাতে যেন সৌন্দর্যের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। সীমার চোখে চোখ পড়তে কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে কাব্যর। ওই চোখের মায়ায় কি যেন ভাষা আছে, কাব্য বুঝে না।

দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল সীমা। সীমাকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল কাব্য। কাব্যকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে বই আনতে গেল সীমা। বই নিয়ে এসে কাব্যর মুখোমুখি বসল।

কি কি পড়েছে, পড়ায় অসুবিধা আছে কিনা এসব নিয়ে আলোচনা করছে সীমা। মাঝে মাঝে যেসব বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আজ পড়ানোতে মন নেই কাব্যর। বারবার চোখ যাচ্ছে সীমার দিকে। সীমার চোখের মায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বারবার। সীমার ডাকে বাস্তবে ফিরল কাব্য।

‘কি দেখছ এভাবে?’ জিজ্ঞেস করল সীমা।

‘কিছু না।’ মাথা নেড়ে উত্তর দিলো কাব্য। কিন্তু সন্দেহ গেল না সীমার। বিস্ময় নিয়ে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো কাব্যর দিকে। এরপর পড়ায় মন দিলো আবার।

খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে সীমা। পড়ার সময় ভেজা চুলগুলো সামনে চলে আসছে। পড়ায় অসুবিধা হচ্ছে। কাব্যর ইচ্ছা করছে নিজের হাতে চুলগুলো সরিয়ে দিবে। তবে তা করা যাবে না। মুগ্ধ হয়ে দেখছে সীমাকে। এই মুগ্ধতায় সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল কাব্য।

অবশেষে পড়ার সময় শেষ হলো। যেন অন্ততকাল ধরেই সীমার সামনে বসে ছিল। এমনি মনে হচ্ছে কাব্যর। এই সময়গুলো যদি না ফুরাতো! সীমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো। বাইরে বৃষ্টির তেজ বেড়েছে। রাস্তায় পানির স্তরও বাড়ছে একটু একটু করে। বৃষ্টির ধারা এমন থাকলে পুরো এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। হাতে ছাতা থাকলেও আর খুলল না কাব্য। বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, রাস্তার পানি মাড়িয়ে নিজের বাসায় এসে পৌছালো কাব্য।

বাসায় পোঁছে সবার প্রথমে নিজের ভেজা কাপড় বদলে নিলো কাব্য। ফ্রেশ হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে লাবণীর নাম্বারে কল করল। রিং বাজছে ওপাশে। কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। রিং বাজতে বাজতে একসময় থেমে গেল। আবার কল করল কাব্য। এবারও রিসিভ করল না লাবণী। মেয়েটার এই এক সমস্যা! প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না।

স্বাভাবিকভাবে দুইবার কল দেওয়ার পর কেউ রিসিভ না করলে, আবার কল দেওয়া অভদ্রতা। কেননা, ব্যস্ততার জন্য যে রিসিভ করেনি তাকে আরেকবার কল দিয়ে বিরক্ত করা অনুচিত। কিন্তু মনের মাঝে অস্থির লাগছে কাব্যর। তাছাড়া লাবণীর কাছে আবার কিসের ভদ্রতা-অভদ্রতা! তাই এবার কল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো কাব্য।

তৃতীয়বার কল দিতে যাবে এমন সময় বেজে উঠল ফোনটা। লাবণী নিজেই কল করেছে। ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই লাবণীর কণ্ঠ, ‘কিরে, কি হয়েছে?’

লাবণীর কথায় অবাক হয়নি কাব্য। মেয়েটা কি করে যেন বুঝে যায় সবকিছু। কাব্যর ভালো থাকা, খারাপ থাকা, মনের মধ্যে থাকা অস্থিরতা সবই বুঝে মেয়েটা। কি করে বুঝে কাব্য জানে না। শুধু জানে, এই মেয়েটা না থাকলে হয়ত ভালো থাকার শক্তিটা পেতো না সে।

‘তোর সাথে জরুরি কথা আছে।’ বলল কাব্য।

‘তা তো বুঝতেই পারছি।’ জবাব দিল লাবণী। ‘আমি দেখতে পাচ্ছি তুই খুব অস্থির হয়ে আছিস।’ কিভাবে দেখতে পারছে কাব্য জিজ্ঞেস করল না। ফোনের ভেতর হয়ত চোখ আছে লাবণীর, তা দিয়েই কাব্যর সবকিছু দেখতে পায় সে। তা নিয়ে মাথা ঘামায় না কাব্য।

‘আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বলল কাব্য।

‘কি সিদ্ধান্ত?’ প্রশ্ন করল লাবণী।

‘আমি সীমাকে সব কিছু বলব।’ কাব্যর উত্তর। ‘আমি বলব, আমি ওকে ভালোবাসি।’

কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকল লাবণী। তারপর বলল, ‘আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম, সব বলে দে। তুই তো আমার কোনো কথাই শুনিস না। তা হঠাৎ এই ভালবাসা বুঝলি কি করে?’

‘জানি না! শুধু জানি সীমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। ওর হাসিমাখা মুখ দেখতে ভালো লাগে। ওর পাশে থাকতে ভালো লাগে।’

‘তা কিভাবে কি বলবি ভেবেছিস কিছু?’

‘কিছু জানি না আমি। এই জন্যই তো তোকে ফোন দিলাম।’

কি যেন ভাবল লাবণী। এরপর বলল, ‘ঠিক আছে, কাল দেখা কর। আমি ভেবে দেখি কি করা যায়।’

এরপর আরও কিছুক্ষণ কথা বলে বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিলো দুজন।

 

পরদিন সকাল সকাল লাবণীর সাথে দেখা করল কাব্য। লাবণীর মতে, একটা আংটি নিয়ে যেয়ে সীমাকে প্রপোজ করা উচিৎ। এ প্ল্যান নাকচ করে দিলো কাব্য। কিন্তু লাবণী নাছোড়বান্দা। জোর করেই সীমার জন্য সিম্পল কিন্তু অসম্ভব সুন্দর এক আংটি কিনে দিলো লাবণী। বলল, এটা নিয়ে মনের সব কথা যেন বলে। সাথে হাসতে হাসতে একটা প্রেমের কবিতা নিয়ে যেতে বলল।

‘তোর বস্তাপচা কবিতা তো সীমা পছন্দ করে। নিয়ে যাস একটা লিখে। ঐটা দেখে পাগল হয়ে রাজি হয়ে যাবে।’ লাবণীর যেন হাসি থামছেই না। রাগ লাগছে কাব্যর, কিন্তু কিছু বলছে না। কিভাবে বলবে। নার্ভাসনেসে ভিতরটা উথাল পাতাল করছে। আজ তো সেই দিন! সন্ধ্যায় সীমাকে বলবে সব। কি।রিয়েকশন হবে সীমার? এ নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই কাব্যর।

 

সন্ধ্যা ৭টা। সীমার বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাব্য। বুকটা দুরুদুরু করছে। পকেটে রাখা আংটির প্যাকেট একবার ছুঁয়ে দেখল সে। একটা কাগজও আছে। লাবণীর কথা মতো একটা কবিতা লিখে এনেছে। কাব্যর নিজের সেই কবিতা খুব পছন্দ হয়েছে। জীবনের সেরা কবিতাটা লেখার চেষ্টা করেছে আজ। কে জানে? সীমার পছন্দ হবে কিনা! সীমা কাব্যকে গ্রহণ করে কিনা! যদি রাজি না হয়? যদি ওভার রিয়েক্ট করে? এসব চিন্তায় দরদর করে ঘামছে কাব্য।

সাহস সঞ্চয় করে বেল বাজালো কাব্য। প্রতিদিনের মতো আজকেও মিষ্টি এক হাসি দিয়ে সীমাই দরজা খুলেছে। আজ সেই হাসি দেখার সময় নেই। খুব নার্ভাসনেসে ভিতরটা তোলপাড় হচ্ছে।

‘কি হয়েছে, ভাইয়া?’ জিজ্ঞেস করল সীমা। ‘শরীর খারাপ? এভাবে ঘামছ কেন?’

‘না, কিছুনা।’ তাড়াহুড়োয় জবাব দিলো কাব্য। ‘আজকে একটু বেশি গরম পড়েছে।’ কাব্যকে এভাবে ঘামতে দেখে সিলিং ফ্যানটা ফুল স্পিডে দিয়ে দিলো সীমা।

কিভাবে কি বলবে চিন্তা করছে কাব্য। এখনই বলবে? না থাক, ও পড়ছে। একটু পড়েই বলবে।

‘ভাইয়া, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’ হঠাৎ করে বলে উঠল সীমা। সীমার কথায় ধক করে উঠল কাব্যের বুক। কি বলবে সীমা? এমন কিছু নয় তো! যা কাব্য কখনোই কল্পনা করতে পারবে না?

‘কি কথা, সীমা?’ জিজ্ঞেস করল কাব্য। সীমা যা বলল তাতে কাব্যর আশংকাই ঠিক হলো। কখনো কল্পনা করতে পারেনি এমন হবে। নিজের ইচ্ছেটুকু বিসর্জন দিলো কাব্য। শুধু বলল, ‘ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করব।’

কাব্য সীমাকে বলেনি তার মনের কথা। বলার মতো অবস্থাও ছিল না। আজ খুব অল্প সময়ে সীমাকে পড়িয়ে বের হয়ে আসে। রাস্তায় হাঁটছে এক অজানার উদ্দেশ্যে। যেন এই পথের ঠিক নেই। পকেটে থাকা কবিতার কাগজ দুমড়ে মুচড়ে ড্রেনের পানিতে ফেলে দিলো সে। আংটিটাও ফেলে দিতে চাইলেও কি ভেবে তা আর ফেলল না।

 

দুই দিন পেরিয়ে গেছে। কাব্যর কোনো খোঁজ নেই। ফোন দিলে ধরছে না। মেসেজ দিলে রিপ্লাই দিচ্ছে না। ফেসবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাব্যকে না পেয়ে পাগলপ্রায় লাবণী। অজানা আশংকায় বুক কেঁপে উঠছে বারবার। সেদিন সীমাকে সবকিছু খুলে বলার কথা ছিল। বলতে পেরেছে কাব্য? এরপর কি হয়েছে? কিছুই জানে না সে। কাব্যও কিছু জানায়নি। এরপর থেকেই রীতিমতো উবে গেছে কাব্য। এর একটাই কারণ হতে পারে। সীমার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে। তাও তো বলবে? চিন্তা হয় না?

এমন সময় মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল লাবণীর। কাব্যর ফোন। রিসিভ করে কানে ঠেকানোর সাথে সাথেই কাব্যর কণ্ঠ শুনতে পেলো লাবণী।

‘এতবার ফোন দিতে হয়? মানুষ তো ব্যস্ত থাকতে পারে। সময় হলে আমিই তো তোকে ফোন দিতাম। তাই না?’ লাবণীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে এক নিঃশ্বাসে করে বলে চলল কাব্য।

‘কি হয়েছে তোর?’ জিজ্ঞেস করল লাবণী।

‘কিছু না।’ জবাব দিলো কাব্য। তারপর বলল, ‘কাল আমার সাথে দেখা করতে পারবি? টিএসসিতে?’

‘সে নাহয় দেখা করলাম।’ বলল লাবণী। ‘কিন্তু কি হয়েছে, সেটা তো বলবি? সীমা কি বলল?’

‘কাল দেখা করে সব বলি? সময় মতো চলে আসিস।’ বলেই হুট করে ফোন কেটে দিলো কাব্য। কি হলো, কিছুই বুঝতে পারছে না লাবণী। ফোনের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছে!

 

আজ সময়ের আগেই চলে এসেছে লাবণী। মনের মধ্যে অজানা আশংকা, চাপা টেনশন। তাই তাড়াতাড়িই এসেছে। এসে দেখে কাব্য আরও আগে এসে বসে আছে।

পেছনে যেয়ে কাব্যর এক কাঁধে হাত রাখল লাবণী। জিজ্ঞেস করল, ‘কখন এসেছিস?’

‘বেশিক্ষণ হয়নি।’ কাব্যর উত্তর। ‘আয়, বস।’ লাবণী যেয়ে কাব্যর পাশে বসল।

‘এবার বল তো কি হয়েছে?’ কাব্যর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল লাবণী। ‘দুই দিন ধরে তোর কোনো খোঁজ নাই। চিন্তা হয় না আমার? এমন উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করছিস কেন?’

‘সব বলছি।’ বলে সেদিনের ঘটনা লাবণীকে ব্যাখ্যা করতে লাগল কাব্য। সেদিন সীমা কাব্যকে বলে, সে একজনকে পছন্দ করে। ছেলেটার নাম ফুয়াদ। ওদের পরিচয় হয় ফেসবুকে। সেখান থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে ভালো লাগা। দুইজনই দুইজনকে পছন্দ করে।

সীমা কাব্যর কাছে একটা সাহায্য চেয়েছিল। সীমা খুব একটা বাসা থেকে বের হয় না। আর এভাবে চেনা নেই, জানা নেই একজনের সাথে দেখা করতে নার্ভাস ফিল করছিল, তাই তাদের প্রথম দেখায় কাব্য যদি সাথে থাকে তাহলে সীমার জন্য বিষয়টা সহজ হয়ে যায়।

‘আর তুই বলেছিস সাহায্য করবি?’ জিজ্ঞেস করল লাবণী।

মাথা নেড়ে সম্মত জানালো কাব্য। বলল, ‘কিছুক্ষণ পর ওরা দুইজন এইখানে আসবে।’

‘কি!’ আচমকা চিৎকার করে উঠল লাবণী। তার চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে দেখছে। নিজেকে সামলে নিয়ে লাবণী বলল, ‘তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, কাব্য?’

‘না, আমি পুরোপুরি সুস্থ আছি।’ জবাব দিল কাব্য। এমন সময় কাব্যর ফোন বেজে উঠল। সীমা ফোন দিয়েছে। ফোন রিসিভ করে জানলো সীমা চলে এসেছে।

একটি সবুজ শাড়ি পড়ে এসেছে সীমা। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কাব্য চোখ ফিরিয়ে নিলো। তার এখন সীমার দিকে চেয়ে থাকা অনুচিত।

‘কেমন আছ, ভাইয়া?’ জিজ্ঞেস করল সীমা। লাবণীর দিকে ফিরে বলল, ‘আপু, ভালো আছ?’

দুইজনই জানালো ভালো আছে। কিছুক্ষণ পর ফুয়াদ এসে ঢুকল। ফুয়াদের সাথে দুইজনের পরিচয় করিয়ে দিলো সীমা।

‘তাহলে সীমা,’ বলল কাব্য। ‘তোমরা থাকো। আমরা যাই। আশেপাশেই থাকব। ফোন দিও।’

কাব্যর সামনে এসে দাঁড়ালো সীমা। দুই হাত ধরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া।’ মুখে একটা হাসি রেখে সীমার মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নিলো কাব্য।

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক কোণে বসে আছে কাব্য ও লাবণী।

‘তুই আর কত মহান হবি কাব্য?’ আচমকা প্রশ্ন করল লাবণী।

লাবণীর প্রশ্নের উত্তরে কেবল হাসলো কাব্য, কিছু বলল না। একটু পর নিজে থেকেই বলা শুরু করল, ‘আমি সীমাকে পাই নি। পাবোও না। কিন্তু সীমা যাকে চায় তাকে পেলে ক্ষতি কি? ও তো হাসিখুশি থাকবে। ওর হাসিখুশি দেখলে যে আমারও ভালো লাগবে। আর যদি এই হাসিটা আমার জন্য হয়, তাহলে আমাকে অপূর্ণ পাওয়াগুলো একটু হলেও পূর্ণ হবে।

কাব্যর এই হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকা দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া অনুভূতিগুলো লাবণী বুঝে। ‘তুই খুব অদ্ভুত, সত্যিই অদ্ভুত!’ বলল লাবণী। কাব্যর হাত ধরল লাবণী। পাঁচ আঙুলের ফাঁকে নিজের পাঁচটি আঙুল ঢুকিয়ে শক্ত করে ধরল। এই হাত ছাড়া যায় না।

সীমার জন্য কেনা আংটিটা বের করল কাব্য। আচমকা লাবণীর আঙুলে পড়িয়ে দিল। আর বলল, ‘সীমাকে তো দিতে পারলাম না। তুই পড়। তোকে সুন্দর লাগবে।’

দুই হাতে কাব্যর বাহু ধরে কাঁধে মাথা রাখল লাবণী। কেমন এক প্রশান্তি খেলে গেল মনের মধ্যে। নিজেকে আজ সবচেয়ে বেশি সুখী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ওর মতো ভাগ্যবান এই দুনিয়ায় একটিও নেই। এমন বন্ধু  যে লাখে একটা মেলে !!!

পেপারস লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ