সিআইএ-র যে গোপন তথ্যে প্রাণ হারালেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি


সিআইএ-র যে গোপন তথ্যে প্রাণ হারালেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার নেপথ্যে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক নজিরবিহীন ও নিবিড় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-র সংগৃহীত অতি-গোপনীয় তথ্যের ভিত্তিতেই তেহরানের সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে শনিবার সকালে এই ভয়াবহ অভিযান পরিচালিত হয় বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ সূত্র।


কয়েক মাসের ছায়া অনুসরণ

যুগান্তকারী এই অভিযানের বীজ বোনা হয়েছিল কয়েক মাস আগেই। সিআইএ-র একটি বিশেষ দল দীর্ঘ সময় ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির দৈনন্দিন রুটিন, চলাফেরা এবং তাঁর অতি-সুরক্ষিত অবস্থানের ওপর কঠোর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে তাঁর জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অভ্যাসগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের এই যৌথ মিশন যখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে, ঠিক তখনই সিআইএ-র হাতে আসে সেই ‘গোল্ডেন ইন্টেলিজেন্স’ বা অমূল্য তথ্য। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের একটি গোপন কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—দীর্ঘদিন জনসমক্ষে না আসা খামেনি নিজে সেই বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।

নিখুঁত টাইমিং ও ওয়াশিংটন-তেল আবিব সমন্বয়

অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শনিবার সকালের ওই বৈঠকটি ছিল ইরানি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি কৌশলগত আলোচনা। সিআইএ যখন খামেনির উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করে, তখনই হোয়াইট হাউস ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা দপ্তরের (আইডিএফ) মধ্যে লাল টেলিফোনে শুরু হয় চূড়ান্ত আলাপ। ওয়াশিংটন থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই ইসরায়েলি বিমান বাহিনী তাদের ‘অদৃশ্য’ যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার ড্রোন নিয়ে হামলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভুলতা এতটাই বেশি ছিল যে, হামলার সময়টি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যখন খামেনি কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রবেশ করছিলেন। তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এই হামলাটি কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্বের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি বিশ্বাসঘাতকতা?

ইরানের মতো একটি কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর দেশে কীভাবে সিআইএ খামেনির গোপন বৈঠকের তথ্য পেল, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে বিশ্বজুড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে থাকা কোনো উচ্চপদস্থ সূত্রের মাধ্যমেই এই তথ্য পাচার হয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)-এর ভেতরের ফাটলই কি এই হত্যাকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করে দিল? এই প্রশ্নটি এখন সবচাইতে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


অভিযানের নেপথ্যে থাকা প্রধান তথ্যসমূহ:

  • সিআইএ-র ভূমিকা: কয়েক মাস ধরে খামেনির চলাফেরার প্রতিটি ধাপ নজরে রাখা এবং সোর্সের মাধ্যমে বৈঠকের খবর নিশ্চিত করা।

  • টার্গেট: তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত কমপ্লেক্স, যেখানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জরুরি সভা চলছিল।

  • সমন্বয়: হামলার ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং।

  • ফলাফল: সর্বোচ্চ নেতাসহ ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষ সারির কয়েকজনের মৃত্যু।


ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সংঘাতের নতুন মোড়

এই হত্যাকাণ্ডের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরান এখন নেতৃত্বের সংকটে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান প্রমাণ করল যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সুরক্ষিত দুর্গও তাদের নজরদারির বাইরে নয়। তবে এই ‘ইন্টেলিজেন্স গেম’ বা গোয়েন্দা যুদ্ধের ফলস্বরূপ তেহরান থেকে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত বা প্রক্সি যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।