মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গে টালমাটাল হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’।
তেহরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে বিশ্বের এই প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
হরমুজ প্রণালি: কেন এটি বিশ্বের ‘লাইফলাইন’?
ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি মূলত বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি। প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ভারতের বিখ্যাত আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকুইরাস সিকিউরিটিজ’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়, তবে জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।
এনডিটিভির বরাতে জানা গেছে, বর্তমানে ইরান দৈনিক প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ।
আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটি কম মনে হলেও, ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে এর প্রভাব অপরিসীম। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, তেহরান যদি সরবরাহ বন্ধ করে দেয় বা এই রুট দিয়ে অন্যান্য দেশের তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তবে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
গাণিতিক সমীকরণে তেলের মূল্যের লাফ
জ্বালানি বাজারের একটি সাধারণ সূত্র হলো—প্রতি ১ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সেই হিসেবে, যদি শুধুমাত্র ইরানের নিজস্ব তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইকুইরাস সিকিউরিটিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান উত্তেজনার পারদ যদি না কমে, তবে অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমান পর্যায় থেকে লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারের কোটা স্পর্শ করতে পারে। এটি কেবল তেলের দাম নয়, বরং বিশ্বব্যাপী পরিবহন খরচ, কৃষি পণ্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কেও উসকে দেবে।
একনজরে সংকট ও প্রভাবের মূল দিকগুলো:
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব: বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়।
ইরানের উৎপাদন সক্ষমতা: দৈনিক ৩৩ লাখ ব্যারেল (বিশ্ব সরবরাহের ৩ শতাংশ)।
মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস: সরবরাহ ১ শতাংশ কমলে দাম বাড়তে পারে ৩-৫ শতাংশ।
সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দাম: তেলের ব্যারেল ১১০ ডলারে পৌঁছানোর প্রবল ঝুঁকি।
আঞ্চলিক অস্থিরতা: ইসরায়েল ও ইরানের প্রত্যক্ষ সংঘাত লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের নৌপথকে অনিরাপদ করে তুলেছে।
উদ্বেগের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে আমি দেখছি, তেলের এই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য অশনিসংকেত। ডলার সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েনের মধ্যে তেলের দাম ১১০ ডলারে পৌঁছালে তা জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করবে। তেলের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ওপর সরাসরি কোনো আক্রমণ হলে বা তেহরান যদি পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

