‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্য সঠিক নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী



পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি আইজিপির ওই মন্তব্যের পর নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবেই ক্রসফায়ার সমর্থন করে না এবং এ বিষয়ে সরকারের নীতি সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার মুখ থেকে এমন শব্দ আসার পর স্বাভাবিকভাবেই নানা মহলে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া একেবারেই উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বিষয়টির ইতি টানার চেষ্টা করেছেন।

রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর প্রধান হিসেবে আইজিপির মন্তব্য সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করে জানান, আইজিপি সম্ভবত অসতর্কতাবশত এমন মন্তব্য করে ফেলেছেন। সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ফলে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান আবারও জনসমক্ষে স্পষ্ট হলো। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো অপরাধের বিচার প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়াই কাম্য। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের এমন মন্তব্য জনমনে ভীতি তৈরি করতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ত্বরিত পদক্ষেপ সেই ভীতি দূর করে নাগরিকের আইনি সুরক্ষার অধিকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দেশের মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। বিভিন্ন সময় দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে আসছে। দেশের আইনি ব্যবস্থায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করাই পুলিশের প্রধান কাজ। এমন প্রেক্ষাপটে বাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকে ক্রসফায়ার নিয়ে কোনো বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা দিতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সরাসরি আইজিপির বক্তব্যের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং এটিকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনকে পরোক্ষভাবে একটি কড়া বার্তাও দেওয়া হলো।

নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বা কোনো বিশেষ অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত পন্থা অবলম্বন দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে। অপরাধ দমনে পুলিশের পেশাদারিত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবে জরুরি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই স্পষ্ট বার্তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক ও আইনানুগ হতে বাধ্য করবে। একইসঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে, সরকার পুলিশি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো যেকোনো বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।