করোনাভাইরাস আতঙ্কে হঠাৎ থমকে গেছে পর্যটন, ব্যবসা ও চিকিৎসার জন্য বিদেশীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান সিঙ্গাপুর।
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ হাজার যাত্রী কম আসছে, যা ভবিষ্যতে আরো কমতে পারে। আর পর্যটকের অভাবে সিঙ্গাপুরের বড় বড় হোটেলও অনেকটা ফাঁকা। আর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যারা এখনো সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করছেন, তারাও হোটেল ও কাজের ক্ষেত্র ছাড়া খুব বেশি বের হচ্ছেন না।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়েছে কঠোর সতর্কতা। ব্যবসা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে যারা দেশটিতে আছেন, তাদের প্রতিবার হোটেলে প্রবেশের সময় শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই অবস্থা হাসপাতাল ও ওষুধ কিনতে ফার্মেসিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও। আর দেশটিতে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে যারা অবস্থান করছেন, তাদেরও ডরমিটরি থেকে বের হওয়ার সময় এবং কাজ শেষে ডরমিটরিতে ফেরার পর শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আবার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়ও তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কারো শরীরের তাপমাত্রা সাড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তাকে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে নেয়া হচ্ছে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারান্টাইনে।
জানা গেছে, সিঙ্গাপুর সরকার করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে তিনটি রিস্ক লেভেল নির্ধারণ করেছে—ইয়েলো, অরেঞ্জ ও রেড। ইয়েলো মানে আক্রান্ত রোগীরা চীনা নাগরিক কিংবা সর্বশেষ চীন ভ্রমণ করে এসেছে। দ্বিতীয় রিস্ক লেভেল অরেঞ্জ মানে কিছু স্থানীয় লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, যাদের কেউ চীন ভ্রমণ করেনি কিংবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগীর সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। সর্বশেষ রিস্ক লেভেল রেড মানে সারা দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি হলে তখন সব অফিস, স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে দেয়া হবে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি রিস্ক লেভেল অরেঞ্জ ঘোষণা করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। এর পর থেকেই দেশটির স্থানীয় এমনকি প্রবাসীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দোকানগুলোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার হিড়িক পড়ে যায়। মাস্কশূন্য হয়ে যায় প্রায় সব স্টোর।
দেশটির সবচেয়ে বড় চেইন শপ ‘মাদারশিপ’ এক প্রতিবেদনে জানায়, রিস্ক লেভেল অরেঞ্জ ঘোষণার পর থেকেই দুর্যোগ মোকাবেলায় অতিরিক্ত খাবার সংগ্রহ করতে অসংখ্য মানুষ স্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করে। ফলে বেশির ভাগ দোকানেই শুকনো খাবারের সংকট দেখা যায়। সেখানে ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং পাস্তাজাতীয় শুকনো খাবারগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যেতে দেখা যায়। অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন টয়লেট পেপারও কিছু জায়গায় শেষ হয়ে যেতে দেখা যায়। দোকানগুলোতে অনেক রাতেও মানুষের ভিড় জমতে দেখা যায়।
সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ বলছে, সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, আর কতদিন এই মহামারী থাকবে এবং এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কেমন হবে। দ্বিতীয়ত, সিঙ্গাপুরসহ এ অঞ্চলের বাকি দেশগুলোতে কতদিন এ অবস্থা থাকবে। তৃতীয়ত, পর্যটকের সংখ্যা স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগতে পারে।
উল্লেখ্য, অবকাঠামো খাতই সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে। আর এজন্য দেশটিকে প্রচুর বিদেশী শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের জুনের এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীন থেকে ৩ লাখ ৭০০ শ্রমিক দেশটির নির্মাণশিল্পে নিয়োজিত। যদিও সিঙ্গাপুরে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নির্মাণ ও মেরিন সেক্টরসহ অনেক কোম্পানি থেকে অভিবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীনের শ্রমিকরাও। করোনা আতঙ্কে যাদের অনেকেই এখন দেশে ফিরতে শুরু করেছেন।

