২৪ মার্চ ২০২০:
সারাদিন অফিস করে সন্ধ্যায় হোস্টেলে ফিরলাম। ওই হোস্টেল থেকে ব্যাগ-ব্যাগেজ রাতের বেলায় আরেক হোস্টেলে শিফট করলাম। সরকার ঘোষণা দিয়েছে পরদিন থেকে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ। ২৫.৩.২০ থেকে ৪.৪.২০ পর্যন্ত অফিসও বন্ধ। অথচ বাসায় যাওয়া হবেনা ভেবে খুব মন খারাপ হলো। অর্ধেক ঘর গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলাম। ঘুমোতে যাওয়ার সময় অভ্যাসবশত অনলাইনে গেলাম। প্রচুর যাত্রী সহ লঞ্চ এবং ফেরীর ছবি তে ফেসবুকের হোমপেজ ভর্তি। দু’একজন আমাকে আমার ভালোর জন্যই ওসব ছবি ইনবক্সও করেছে। যাতে আমিও বাসায় না যাই। সেসব দেখে আর তাদের পোস্ট পড়ে মনে হলো থাক এই কয়টা দিন ঢাকাতেই না হয় থেকে যাই। মন খারাপ নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।
২৫ মার্চ ২০২০:
প্রতিদিনকার মতো সকাল ৭.৩০ এ ঘুম ভাঙলো এবং মনে হলো রিস্কি হলেও লাস্ট চান্স টা নিয়ে দেখি। হাজার হোক বাইবর্ন বাঙালি বলে কথা! বাসায় যাইনা পাঁচ মাস (যদিও এর মধ্যে মা-বাপি কয়েকবার ঢাকায় এসেছে তবুও)। গল্প/উপন্যাসে পড়েছি মেয়েরা এক কাপড়ে প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আমিও ঠিক সেভাবেই এক কাপড়ে শুধু ল্যাপটপ টা সাথে নিয়ে বের হয়ে গেলাম হোস্টেল থেকে (এমন কি চার্জার টাও নেইনি ল্যাপটপের)। বহু নাটকীয়তা শেষে দুপুরের দিকে নিরাপদেই বাসায় পৌঁছালাম (‘ঐতিহাসিক মাদারীপুর। বাংলাদেশের প্রথম লকডাউন এলাকা’…..)।
সেদিন রাতেও সেই লঞ্চ/ফেরীর ছবি দেখে লজ্জা লাগলো। নিজেকে নিজেই বেকুব/হুজুকে বাঙালি বলে গালাগাল দিলাম। মা-বাপি ও খুব বকলো এতোটা রিস্ক নিয়ে এলাম বলে।
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রথম দেখার গল্প”
৩ এপ্রিল ২০২০:
৪ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি এক্সটেন্ড করেছে সরকার। সেই অনুযায়ী সন্ধ্যা বেলায় অফিসিয়ালি নোটিশ পেলাম আমাদের অফিসও ১১ তারিখ থেকে শুরু হবে।
১০ এপ্রিল ২০২০:
সরকার ১১ এপ্রিল থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত আবার ছুটি বাড়িয়েছে। সুতরাং সেই অনুযায়ী আমরা ও এবার ২৬ এপ্রিল থেকে অফিস করার নোটিশ পেলাম।
১৪ এপ্রিল ২০২০:
প্রতি বছর এপ্রিলের সেকেন্ড উইক থেকে সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হতো। তাই টানা পাঁচটা বছর মা-বাপি ছেড়ে হোস্টেলে নববর্ষ কাটিয়েছি। লাস্ট ইয়ার অবশ্য আনঅফিসিয়ালি অফিসে নববর্ষ সেলিব্রেট করেছিলাম। পাঁচ বছর পর মা-বাপির সাথে এবার নববর্ষ কাটালাম। তাও আবার গৃহবন্দী!
২৯ এপ্রিল ২০২০
এই দিনে বাপির জন্মদিন। ছয় বছর পর এইদিনে আমি বাসায়। অনেক কিছু করার সুযোগ থাকলেও কিছুই করা হয়নি। এই লকডাউনে ঘরবন্দী অবস্থায় কি বা করার আছে। শুধু এটুকুই বলতে পারি, প্রচণ্ড ভালোবাসি বাপিকে। দু’চার লাইন লিখে তা বোঝানো যাবে না। মা বাপির পাশে থাকাটা অবশ্যই আমার জন্য ব্লেসিং। লকডাউন নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও, এই একটা দিনের জন্য শত অভিযোগ মাফ করে দেওয়াই যায়।
১৮ মে ২০২০:
প্রথমে শুনেছিলাম অনলাইনে শুধুমাত্র বি.ফার্ম দেরই এক্সাম হবে। তাই ইচ্ছা মতো এতোদিন জুনিয়র দের পঁচিয়েছিলাম। যে অনলাইন এক্সাম দিয়ে অনলাইন ফার্মাসিস্ট হয়ে মানুষ মারার ওষুধ বানাবে তারা!!
পরে ডিসিশন হলো এম.ফার্ম দের মিড ও অনলাইনে হবে। অবশেষে অনলাইন এক্সাম দিবো বলে এতোগুলো পেন্ডিং টাকা ভার্সিটিতে দিয়ে দিলাম। সাথে বিকাশ খরচ টাও! এই এক্সট্রা টাকার শোক তো জীবনেও ভুলবোনা!!
তিথি রায় পূজার গল্প “সিভিয়ার ক্রাশ”
১৯ মে ২০২০:
আজ আমরাও ২০২০ সালের সবথেকে বড় উদাহরণ গড়ার তালিকায় নাম লেখালাম অনলাইন এক্সাম দেয়ার মাধ্যমে। অতি এক্সাইটমেন্টের অবসান ঘটিয়ে আমরাও সাকসেসফুলি ‘টক্সিকোলজি পার্ট-এ’ এম.সি.কিউ এক্সাম দিলাম৷
এতো দিন হলে বসে এক্সাম দেয়ার সময় দেখতাম, ইনভিজিলেটররা গল্প করে আর চা খেতে খেতে আমাদের কড়া গার্ড দিতো। আজ আমিও সুযোগ পেয়ে কিঞ্চিৎ রিভেঞ্জ নিলাম। চা খেতে খেতে পরীক্ষা দিলাম!
২০ মে ২০২০:
আজ টক্সিকলজি পার্ট-বি এক্সাম। একটা করে প্রশ্ন লিখি, নাটক দেখি আবার লিখি৷ সারাদিন ধরে লিখে বিকেল বেলা মেইলে এক্সাম পেপার’স সাবমিট করলাম।
২১ মে ২০২০:
আজ মার্কেটিং পার্ট-এ এক্সাম। এক ঘণ্টা দশ মিনিটে দুইটা প্রশ্ন (প্রতি প্রশ্নে আবার দুইটা করে প্রশ্ন, মোট চারটা প্রশ্ন) লিখে নির্ধারিত সময়েই উত্তরপত্রের ছবি তুলে মেইল পাঠালাম।
২২ মে ২০২০:
আজ মার্কেটিং পার্ট বি এক্সামের মাধ্যমে এম.ফার্ম মিডের সমাপ্তি ঘটলো। আহারে দুনিয়ার সব এক্সাম গুলো যদি এমন হতো!!
২৫ মে ২০২০:
হয়তো আমার জন্মের পর এবারই প্রথম একটা ঈদ, যেদিন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার আমরা বাসায় করলাম। প্রতিবছর ঈদের দিন তিন বেলাতেই বাপির কলিগদের বাসায় ইনভাইতেশনে যাওয়া হতো। প্রথমবার গৃহবন্দী একটা ঈদ কাটলো। জাতি কারোর ‘Day 1/Day 2/Day 3’ ক্যাপশনের কোনও ছবি পেলোনা!
২৯ মে ২০২০:
হোম কোয়ারেন্টাইনের ৬৫ দিন। এবং এই ৬৫ দিনের শুধু প্রথম দিনটা বাদ দিয়ে বাকি ৬৪ দিনই মা-বাপির মুখে নিয়ম করে দুবেলা (০+১+১) ১২৮ বার শুনলাম-
এই মেয়ে সারাজীবন ধুমধাম উল্টাপাল্টা ভুলভাল ডিসিশন নেয়। এইটাই জীবনের প্রথম একটা ডেস্পারেট ডিসিশন নিয়ে ভালো করেছে। ও বাসায় না এলে ওর টেনশনেই আমাদের যে কি অবস্থা টা হতো!
(০+১+১ কারণ, এই বাসায় আমার লাইফে ব্রেকফাস্টের কোনও শিডিউল নাই। আমার সকাল হয় বেলা একটায়। সুতরাং লাঞ্চ & ডিনার টাইমে টেবিলে বসে প্রতিদিন দুবেলা করে তাদের এই ডায়লগ আমি ডাইজেস্ট করি!)
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু – দ্বিতীয় অধ্যায়”
৬ জুন ২০২০:
আজ নিয়ে ৭৩ দিন বাসায় আছি। একটু আগেই হোস্টেলের টাকা বিকাশ করলাম। জীবনে হয়তো বহুত টাকা পয়সা আসবে যাবে, কিন্তু একটা দিনও না থেকেই, মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা বলা যায়, তাতেই যে চারমাস ধরে এতোগুলা টাকা হোস্টেলে বিকাশ করলাম, এই শোক ও আমার জীবনে যাবেনা!!!
৯ জুন ২০২০:
আজ নিয়ে ৭৬ দিন। দিন গুনতে গুনতেও টায়ার্ড হয়ে গেছি আজকাল! বাসায় আসার পর প্রথম পাঁচটা দিন আমি আমার প্রিভিয়াস রেগুলারিটি অনুযায়ী রাত বারোটা-সাড়ে বারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে যেয়ে পরদিন সকাল সারে সাতটার মধ্যে উঠে যেতাম।
বাট ৩০ মার্চ থেকে এখন অবধি টানা ইনসমনিয়াক হয়ে গেছি। ঘুমাই তিনটা/চারটা/পাঁচটায় আর উঠি পরদিন এগারো/বারো/একটায়। আমার লাইফে কোনও সূর্যোদয় নাই, সব সূর্যাস্ত! বাসায় সারাদিন শুধু খাওয়াদাওয়া, গল্পের বই, টুকটাক রান্নাবান্না, ইউটিউব, ফেসবুকিং, হতাশা আর ইনসমনিয়া এই নিয়েই চলছে আমার দিনকাল।
১০ জুন ২০২০:
স্টিল নাউ মা-বাপির কমন ডায়লগ ‘ভাগ্যিস ডেস্পারেট ডিসিশন টা নিয়ে মেয়েটা বাসায় আসছিলো!’
আর বাসায় আসার পর সবার সাথেই কমবেশি ফোনে কথা হয়। দুই-তিনজন আছে যাদের সাথে কথা হলো আর এই কমন ডায়লগ টা তারা দিলোনা সেটা কখনো হয়নি। ডায়লগ টা হচ্ছে- ‘ঢাকা ফিরে আর কাজ নাই, একবারে বিয়ে শাদী করে ফেলেন/ফেলো/ফেল!’……..
তিথি রায় পূজার গল্প “;রোদেলা রোদ্দুর”
পরিশিষ্ট:
আজকের একজনের কোভিড পজেটিভ তো কাল অন্যজনের। এভাবেই দিন কাটছে, অতিবাহিত হচ্ছে সময়। আতঙ্কের মাঝে পার হচ্ছে দিন। এর ওর মতো হয়তো কোনও একদিন আমিও! সারাদিন বাইরে থাকা মেয়েটা এখন মা-মাসি দের মতো ফুললি হাউজওয়াইফ টাইপ ঘরবন্দী লাইফ লীড করছে। প্রথম দিকে খুব সাফোকেটেড ফিল হলেও এখন এটাই সহ্য হয়ে গেছে!
পৃথিবী সুস্থ হোক। আর এই সুস্থ পৃথিবীতেই নাহয় আবার বের হবো! আবার স্বস্তিতে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিবো, বেঁচে থাকার আনন্দে…..
(বি.দ্রঃ জীবনে ভালো সময় যেমন আসে, তেমনি খারাপ সময়ও আসে। এই ভালো খারাপের মিশেলে কখনো আনন্দের দিন অতিবাহিত হয়, কখনোবা বেদনার চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে হয়। এতোক্ষণ যা ছিল সবই ভালোর মিশেলে তৈরি। এর মাঝে অনেক খারাপ সময় এসেছে, কিছু দুঃখজনক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। মর্মান্তিক কিছু ঘটনা কিংবা সিদ্ধান্তহীনতার সময়গুলো নাহয় পিছনেই থাক! ভালো সময়ের দিনগুলো স্মৃতিতে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাক, পরবর্তী সময়ের জন্য…)
পেপার’স লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা

