রোদ্দুর: তুমি চুপ কেন রোদেলা? তোমার ব্যাপারে শুনেছিলাম, তুমি নাকি অনেক কথা বলো, খুব মিশুক একটা মেয়ে?
রোদেলা: মিশুক আর বেশি কথা বলা কি একই? আসলে আমি মিশি সবার সাথেই। কিন্তু যাদের সাথে খুব ক্লোজলি মিশি শুধু তাদের সাথেই প্রচুর কথা বলতে পারি।
রোদ্দুর: তাই? প্রায় তিনমাস রেগুলার কথা হয় আমাদের। আর দুমাস পর আমাদের বিয়ে। এখনো কি তুমি আমার সাথে ক্লোজলি মিশতে পারোনা?
রোদেলা: আচ্ছা ঠিক আছে, আজ সারা রাত তবে তোমার সাথে ফোনে কথা বলবো যাও।
রোদ্দুর: নাহ তা তো তুমি পারবেনা।
রোদেলা: তুমি বাজি ধরবে আমার সাথে? আমি অবশ্যই পারবো। এখন বাজে বারোটা একান্ন। সারারাত কথা বলবো। সকালে তোমার অফিস যাবার এক ঘণ্টা আগে ছুটি দিবো। এখন বলও তো, তুমি রাজি??
রোদ্দুর: তুমি মোটেও সারারাত কথা বলতে পারবেনা কারণ আমি আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পরবো।
এবার দুজনেই সশব্দে হেসে উঠলো…..
তিথি রায় পূজার গল্প “সিভিয়ার ক্রাশ”
রোদ্দুর আর রোদেলার এনগেজমেন্ট হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো। রোদেলার অনার্স ফাইনাল দেয়ার পর তাদের বিয়ে। পুরোটাই পারিবারিক ভাবে ঠিকঠাক হয়ে আছে। মাঝে অবশ্য কয়েকবার দেখা হয়েছে তাদের। সেটাও এক প্রকার পারিবারিকই বলা যায়। আগামী শুক্রবার ও তাদের দেখা করার কথা। রোদ্দুর আগেভাগেই বলে দিয়েছে, সেদিন যেনো রোদেলা একা গিয়েই দেখা করে।
শুক্রবার দিনটা রোদেলার জন্য বিশেষ একটা দিন। রোদ্দুরের সাথে দেখা হবে বলে! বিশেষ এই দিনে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠল রোদেলা। ভাবলো আজ রোদ্দুরের জন্য রান্না করে নিয়ে যাবে। প্রতিদিন বাইরে খেতে খেতে বাসার খাবার খুব মিস করে ছেলেটা। ভর্তা-ভাজি টাইপের বাংলা খাবার খুব পছন্দ ওর। তাই রোদ্দুর বলে বিয়ের পর বেশি রান্না বান্না করতে হবেনা রোদেলাকে। শুধু আলুভর্তা, ডালভর্তা আর বেগুন ভর্তা বানিয়ে দিলেই চলবে। আজ কি রান্না করবে ভেবে পেলো না রোদেলা। তাই রান্না করে নিয়ে যাবার প্ল্যানটা আপাতত আজকের জন্য বাদ দিল রোদেলা।
‘তুমি স্ট্যাচু হয়ে গেলে কেনো বলোতো?’ রোদ্দুরের কথায় ঘোর কাটলো রোদেলার।
হেসে মাথা নেরে বলল। ‘কই নাতো। কি খবর তোমার বলো?’
রোদ্দুর হেসে বলল, ‘আগে তোমার খবর বলো। পরশু কি যেনো বলছিলে তোমাদের ব্যাচের সি.আর মিসবিহেভ করেছে না কি সব যেনো বলছিলে?’
রোদেলা হেসে বলল, ‘হুম, তখন তো তুমি অফিসে ছিলে, তাই আর পুরো কাহিনী তখন বলিনি। কতোটুকু বলেছিলাম এখন মনে নেই৷ পরে বলবো থাক।’
রোদ্দুর উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘আরে না না বলো। তোমাদের সি.আর এর কাছে সবাই এ্যসাইনমেন্ট জমা দাও, যারটা সবচেয়ে ইনফর্মেটিভ হয় তারটা কপি পেস্ট করে অন্যের নাম বদলে নিজের নামে চালিয়ে ধরা পরেছে। আর যার টা কপি করেছে সে টের পেয়ে তোমাদের ব্যাচের কো-অর্ডিনেটরের কাছে এটা কমপ্লেইন করেছে। এখন তোমাদের ধারনা হয়েছে সি.আর এই কাজ বেশ অনেক দিন থেকেই করে এসেছে এবং তার কারণে তোমাদের অনেকেরই পারফর্মেন্স নাম্বার হয়তো আশানুরূপ হয়নি বা ফল করেছে এইতো?’
রোদেলা এতক্ষণ মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে শুনছিলো রোদ্দুরের কথা। তারপর বলল, ‘বিশ্বাস করো এইটা তোমার সবথেকে বড় একটা গুন এবং এই জন্যই তোমাকে আমার সবথেকে বেশি ভালো লাগে। তুমি যতোটুকুই কথা বলো, খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা কথা শোনো এবং মনেও রাখো। এটা অবশ্যই খুব এ্যট্রাক্টিভ এন্ড পজিটিভ একটা সাইড তোমার।’
রোদ্দুর ‘তাই নাকি’ বলে হাসতে থাকে।
আর রোদেলা রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, সারাজীবন এমনই থেকো প্লিজ, সারাজীবন আমাকে এখনকার মতোই এতোটাই প্রাইয়োরিটি আর কনসেন্ট্রেশন দিও……
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু – দ্বিতীয় অধ্যায়”
রোদ্দুর হুট করে বলে ওঠে, ‘বিয়ের পর হানিমুনে কোথায় যাবে বলে ডিসাইড করেছো বলোতো?’
‘তুমি যেখানেই নিয়ে যাবে, সেখানেই যাবো।’ রোদেলা উত্তর দিলো।
এবারে রোদ্দুর বলে, ‘ঠিকাছে তাহলে তোমাকে নিয়ে পুরান ঢাকায় যাবো হানিমুনে কেমন?’
রোদেলা হাসতে হাসতে অস্থির হয়ে বলে, ‘পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি বাড়িঘর আর অলি গলি রাস্তা দেখাতে নিয়ে যাবে বুঝি?’
রোদ্দুর উত্তর দিলো, ‘ওই বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে নৌকা ভ্রমণ করবো আর পুরান ঢাকার হাজী & নান্নার বিরিয়ানি খাবো সাথে ডিনারের টাও পার্সেল করে আনবো। যাতে বাসায় ফিরে কষ্ট করে রাঁধতে না হয়। হানিমুনে গেলে তো সাতদিনের মতো থাকা হতো। আমি তোমাকে নিয়ে সাতদিন পুরান ঢাকায় যাবো আসবো আর সাতদিনই আমাদের বেডরুমের বেড টা ফুল দিয়ে সাজাবো। তার মানে টানা সাত দিনই আমাদের ফুলশয্যা হবে। অন্য কোথাও যাবার থেকে এটাই বেশি মজা হবে তাইনা বলো?’
হাসতে হাসতে রোদেলা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। বাতাসে রোদেলার মুখে চুল এসে পরতেই নিস্পলক চোখে তাকিয়ে রোদেলাকে দেখতে থাকলো রোদ্দুর……
অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে রোদেলা বলে, ‘এগুলো কি কিপটামি করার ধান্দা নাকি জনাব? আচ্ছা, হানিমুনের সব টাকা আমিই ক্যারি করবো যাও।’
রোদ্দুর ভ্রু কুচকে বলে, ‘ইশ্ কয় টাকা আর্ন করো যে তুমি স্পন্সর করতে চাও? বাবার টাকা নিতে চাও তাইনা? এটা কখনোই আমি সমর্থন করবোনা। আমার যা সামর্থ্য তাতেই আমি খুশি। শ্বশুরের থেকে শুধু তার মেয়েটা কেই চাই আর কিচ্ছুনা বুঝলে?’
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রথম দেখার গল্প”
রবীন্দ্র সরবোর থেকে তারা ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ সেরে গেলো চন্দ্রিমা উদ্যানে। ওখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে রোদ্দুর রোদেলা কে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো।
দিনটা স্বপ্নের মতো কাটলো তাদের….
রাত্রে রোদ্দুরের ফোন এলো।
কিছুক্ষণ কথা বলতে বলতে রোদেলা টের পেলো, ঘুমে রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে গেছে। তবুও ছেলেটা ফোন রাখছেনা। এবং সেটা ভদ্রতা করে নয় বরং ভালোবেসে। রোদেলা বারবার বলছিলো ফোন রেখে ঘুমোতে কিন্তু রোদ্দুর বারবার বলছিলো না আর পাঁচ মিনিট কথা বলে ঘুমাবো। কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট আর ফুরোচ্ছেনা….
হুট করে একটা সময় ঘুম জড়ানো গলায় রোদ্দুর জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা রোদেলা তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি বলতো? এখনকার যুগে এতো ডিভোর্স কেন হচ্ছে, ভাবলেই তো কেমন অড লাগে।’
রোদেলা স্নিত হেসে উত্তর দিলো, ‘আমার কাছে ভালোবাসা মানে হলো “সময়”। দুজন দুজন কে হিউজ সময় দেয়া। শেয়ারিং, কেয়ারিং, আন্ডারস্ট্যান্ডিং আর হিউজ সময়। আমার মনে হয় সময়ের থেকে বড় উপহার আর হতেই পারেনা। রান্নাবান্না, হাতা খুন্তি, বাচ্চা কাচ্চা, সংসার, জব সব ছাপিয়ে ব্যাল্যান্স করে কিছুটা সময় নিজেদের জন্য আলাদা রাখা উচিৎ। আমার ধারনা এভাবে চললে সব ঠিক থাকবে।’
রোদ্দুর তুমি সবসময় এমনই থেকো প্লিজ৷ আমি তোমার কাছে গাড়ি, বাড়ি, দামী শাড়ি, গয়না কিচ্ছু চাইনা। শুধু আমাকে “সময়” দিও তাহলেই চলবে।’
রোদ্দুর হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘এজন্যই তোমাকে আমার এত্ত ভালো লাগে রোদেলা।’
রোদেলা এবার জোড় করে রোদ্দুর কে ঘুমোতে বলে ফোন কেটে দিলো….
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু”
এভাবেই বেশ কিছুদিন চললো। সামনে রোদেলার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। অথচ হুট করেই কি এক ভাইরাস এসে পৃথিবীকে অচল করে দিলো। বাংলাদেশকেও ছাড় দিলো না! ঘরবন্দী জীবন শুরু হলো সবার। এই ভাইরাসের মহামারিতে থমকে গেছে জীবন। লকডাউনে অলস সময় পার করছে সবাই। কোয়ারেন্টাইনে থেকে কিছুই যেন করার নেই।
পিছিয়ে যেতে বসেছিল রোদেলার ফাইনাল পরীক্ষা। ভার্সিটিতে এক প্রকার জোর করেই অনলাইন পরীক্ষা নিয়ে দায় শেষ করল। কিন্তু তাদের র্যাগডে, এন্ডিং প্রোগ্রাম কিছুই আর করা হলোনা। অথচ ভার্সিটি জীবন শেষ করার সেই প্রোগ্রাম, লাস্ট ক্লাস পার্টি নিয়ে সব মিলিয়ে তাদের কতো শত যে পরিকল্পনা ছিলো, তার কিছুই বাস্তবায়িত হলোনা।
এমন কি রোদেলা রোদ্দুরের বিয়ে টা ও পিছিয়ে গেলো। কবে যে চাড় হাত আবার এক হবে তা জানে না কেউ। আগে দেশ সুস্থ হোক, সুস্থ হোক বিশ্ব! এই প্রতীক্ষায় বসে আছে সবাই। সুস্থ এ পৃথিবীতেই নাহয় নতুন জীবন শুরু করবে দুইজন….
পেপার’স লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা

