দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে চেয়ারম্যানসহ ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মো. আরিফুল হক চৌধুরী।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতের শ্রমিকরা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং যাতায়াত—সবকিছুর ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আগের আয়ে মাস চালানো শ্রমিকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তটি পোশাক খাতের লাখ লাখ শ্রমিকের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান অপরিসীম হওয়ায় মজুরি নির্ধারণে যেকোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ পুরো খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। মন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন সবার নজর থাকবে এই বোর্ড কত দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক কাঠামো প্রস্তাব করতে পারে।
নতুন গঠিত এই কমিটিকে বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রবল চাপ রয়েছে। অন্যদিকে মালিকপক্ষের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শ্রম আইনের বিধি মোতাবেক, সাধারণত মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং নিরপেক্ষ সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকেন। সবার গঠনমূলক আলোচনার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই হবে এই ছয় সদস্যের বোর্ডের প্রধান কাজ।
অতীতে বিভিন্ন সময় মজুরি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। তাই এবার শুরু থেকেই সব পক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে একটি সর্বজনগ্রাহ্য কাঠামো তৈরির তাগিদ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বোর্ডের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে এবং সরেজমিনে বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন ও বাজার যাচাই শেষে তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পোশাক খাতে প্রায় চল্লিশ লাখের বেশি শ্রমিক সরাসরি নিয়োজিত আছেন, যাদের একটি বড় অংশই নারী। তাদের আয় বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর একটি শক্তিশালী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তৃণমূল পর্যায়ের এসব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় বাজারেও গতিশীলতা আসে। তবে কারখানার মালিকরা বরাবরই উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কথা বলে মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। বিশ্ববাজারে পোশাকের দাম আশানুরূপ না বাড়ায় তাদের মুনাফার হার কমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সময় দাবি করা হয়। নতুন গঠিত বোর্ডকে এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে সঠিক সমন্বয় সাধন করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের আন্দোলন ছিল মজুরিকে একটি সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। বর্তমান বোর্ডের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে সেই দাবি পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ সম্পন্ন হলো।

