বাসার ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজেই চলেছে। কারো ধরার নাম নেই। কি ব্যাপার? বাসার সবাই কোথায় গেলো? নিজের ঘর থেকে বের হয়ে বাবা-মায়ের ঘরে উঁকি দিলাম। আম্মু নামাজ পড়ছে, আব্বুকে কোথাও দেখতে পেলাম না। বোধহয় বাথরুমে।
বাধ্য হয়ে ফোন রিসিভ আমাকেই করতে হলো! ফোন রিসিভ করে ‘হ্যালো’ বললাম।
‘হ্যালো, সাকিব আহমেদ বলেছেন?’ ওপ্রান্ত থেকে জবাব এলো। কেমন যেন অধৈর্য কণ্ঠস্বর। কিন্তু চিনতে পারলাম না।
‘জ্বি, বলছি।’ আমি জবাব দিলাম। ‘আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।’
‘আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে বলছি।’ ওপ্রান্ত থেকে জবাব এলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড? আমার কাছে? কি প্রয়োজন? সময়ে অসময়ে বিসিবিকে পঁচানোর জন্যই কি? সাইবার আইনে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে?
সাকিব আহমেদের গল্প “বিজয়োল্লাস”
এসব ভাবতে ভাবতে বললাম, ‘আমার কাছে কি মনে করে?’
‘আপনার কাছে একটি সাহায্যের জন্য ফোন দিয়েছিলাম।’ বলল ফোনের ওপাশে থাকা লোকটি। সাহায্য? আমি? বিসিবিকে কি সাহায্য করতে পারি? আমাকে বিসিবি প্রেসিডেন্ট বানাবে? তা কি করে হয়? তাহলে? উপদেষ্টা? কিছুই তো বুঝছি না।
‘আমি আপনাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
বিসিবি’স সেই লোকটি জানালো, বাংলাদেশ ভারতের টেস্ট চলছে। (সেটা অবশ্য আমি জানি। আজ প্রথমদিন ছিলো। ভালোই খেলছিলো বাংলাদেশ। খেলার খবর আমার থেকে কেইবা জানবে?) কিন্তু সমস্যা হলো, খেলার সময় দুই দলের কোনও এক দলের স্টাফের করোনা ধরা পড়ে। (কার বা কোন দলের তা জানায়নি।) তাই দুই দলের স্টাফসহ পুরো স্কোয়াড, আম্পায়ারসহ সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। এমন সময় অন্য ক্রিকেটারদের খুঁজে নিয়ে এসে খেলা চালানো সম্ভব না। আবার ক্লোজ ডোর ম্যাচ, তাই মাঠে দর্শকও নেই।
সাকিব আহমেদের গল্প “স্ক্রিনের আলোয় পড়াশোনা”
সেকারণেই বিসিবি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকার মধ্যে থাকা এমন এগারোজনকে খুঁজে বের করবে যারা করোনা নেগেটিভ আবার মোটামুটি ক্রিকেট পারে। ভারতের জন্য, ভারতীয় কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থান করছে – এমন মানুষদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের নিয়েই খেলাটা হবে। শুধু শেষ করা দিয়ে কথা!
আমার খোঁজ তারা কিভাবে পেয়েছে জানি না, আমাকে বাংলাদেশের হয়ে এই টেস্ট খেলার প্রস্তাব দিয়েছে। কোনও কিছু না চিন্তা করেই রাজি হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলব! ভাবা যায়!
বিসিবি থেকে জানালো, কাল সকাল আটটার দিকে গাড়ি এসে আমাকে নিয়ে যাবে। আমি যেন রেডি থাকি। আজ প্রথম দিনের খেলা শেষ হয়েছে, কাল দ্বিতীয় দিনের খেলা। খেলা শুরু দশটায়। এর আগে মাঠে উপস্থিত থাকতে হবে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার উত্তেজনায় রাত কিভাবে পর হলো জানি না! আবার স্বপ্নও দেখলাম। প্রথম কোভিড সাবস্টিটিউশন হিসেবে সেঞ্চুরি করে ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছি।
সাকিব আহমেদের গল্প “আবার নয়নরাঙা”
সকাল হতেই রেডি হয়ে বসে আছি। সময়গুলো অস্থিরতায় কাটছে। কখন আসবে গাড়ি? আদৌ আসবে তো? নাকি আমার জায়গায় অন্য কাউকে নিবে। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে সাতটা বাজে। একবার বেলকনিতে, একবার নিজের রুমে, আবার ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছি। সময় যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে গাড়ির শব্দ কানে এলো। বেলকনি থেকে দেখলাম, একটি বিশাল সাদা গাড়ি এসে বাসার সামনে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ তলা থেকে গাড়ির সামনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের লোগো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাসার সবাইকে বিদায় দিয়ে দ্রুত নীচে নামলাম। বিসিবির দুজন কর্মকর্তা এসেছে আমাকে নিতে। তাদের সাথে রওনা দিলাম মিরপুর হোম অব ক্রিকেটের উদ্দেশ্যে।
গাড়িতে আরও চারজনকে দেখা গেলো। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম, তাদেরও আমার মতো টেস্ট শেষ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অবশ্য তাদের সাথে বেশি কথা হলো না। ওরা আমার মতোই নার্ভাস। পাড়ার ক্রিকেট খেলা আর আন্তর্জাতিক লেভেলে খেলা যে এক না। আমাদের মতো কেউই স্বপ্নেও সেই লেভেলে খেলার কথা ভাবতে পারে না। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, ক্ষুদ্র এক অণুজীবের কারণে আজ আমাদেরকেই ক্রিকেটের মর্যাদা রক্ষা করতে হচ্ছে। আর তা দেখার জন্য কোনও দর্শক মাঠে থাকতে পারবে না।
সাকিব আহমেদের গল্প “অনলাইন এক্সাম”
ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করেছি কিছু সময় আগে। ব্যাট করতে নামতে হবে। প্রথম কোভিড সাবস্টিটিউট ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামবো আমি। জার্সি, প্যাড, হেলমেটের পরিবর্তে পিপিই, মাস্ক পড়ে খেলোয়াড় কম, এলিয়েন বেশি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ক্রিকেট খেলতে নয়, মহাকাশ অভিযানে যাচ্ছি।
এভাবেই মাঠে নামলাম। যেই মাঠ টিভিতে দেখে অভ্যস্ত, সেই মাঠে নিজে ব্যাট করতে নামছি। নামতে নামতে শুনতে পেলাম, আইসিসি ঘোষণা দিয়েছে আজকের পর করোনাভাইরাস না যাওয়া পর্যন্ত ক্রিকেট খেলা হবে না! আর এই ক্রিকেট খেলায় করোনাকালের ক্রিকেটের একমাত্র সাক্ষী আমরাই।
ভারতের এক হ্যাংলা পাতলা বোলার কোত্থেকে বিসিবি খুঁজে নিয়ে এসেছে, কে জানে? সেই বল করবে আমাকে। খুব নার্ভাসনেসে প্রথম বল ডিফেন্ড করলাম। একেবারে রক সলিড ডিফেন্স। নিজেকে রাহুল দ্রাবিড় মনে হলো। পরের বলে একটু শাফেল করে অফ স্ট্যাম্পের বাইরে এসে লেগ সাইডে শট করলাম। এবার নিজেকে স্টিভ স্মিথ মনে হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বল পিচেই পরে থাকল। পরের বলে গায়ের জোর দিয়ে শট করলাম। এবার ব্যাটে লাগল বেশ…. কভারের পাশ ঘেঁষে সীমানার বাইরে। মুশফিকুর রহীম মনে হতে হতেও আর হলো না।
নিজেকে সাকিব আহমেদই মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম রান। আর বোধহয় সম্ভব হবে না। করোনার পরবর্তী সময়ে সুস্থ হয়ে যাক এ বিশ্ব। সেই সাথে মাঠের ক্রিকেট মাঠে ফিরুক, সাকিব-মুশফিক-তামিমরা হাল ধরুক এদেশের ক্রিকেটের। আমাদের দ্বারা তা কিছুতেই সম্ভব না। আমরা দর্শক হিসেবেই বেশ আছি!
তারপরও সবকিছু ছাপিয়ে করোনাকালে প্রথম কোভিড সাবস্টিটিউট ব্যাটসম্যান হিসেবে এক টেস্ট খেলা সাকিব আহমেদের নাম আর পাশে কিছু রান হয়তবা দুই একটা উইকেট ইতিহাস হয়ে থাকবে…
পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
সাকিব আহমেদের গল্প “বাঙালীয়ানা”
সাকিব আহমেদের গল্প “স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ”
