‘মা, মা!’ বলে চিৎকার করছে সাজিদ। ছুটে যাচ্ছে মায়ের কাছে। রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত মা। সাজিদের চিৎকার শুনে ফিরে তাকালো। মাকে এসে জরিয়ে ধরল সাজিদ।
‘মা, আমি সিজিপিএ থ্রি পয়েন্ট নাইন ফোর পেয়েছি।’ মাকে জরিয়ে বলল সাজিদ। এই কথা শুনে আবেগে চোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল। কাঁদছেন বলে নয়। কিছুক্ষণ আগে পেঁয়াজ কাটছিল, তাই ঝাঁঝ সহ্য করতে না পেরে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়েছে অশ্রুজল।
একবার কাটা পেঁয়াজের দিকে, আরেকবার সাজিদের দিকে! একবার কাটা পেঁয়াজের দিকে, আরেকবার সাজিদের দিকে! বাংলা সিনেমার মতো এভাবে তিনবার এপাশ ওপাশ ঘাড় ঘোরালেন তিনি। সাজিদকে জরিয়ে ধরে বললেন, ‘আজ যদি তোর বাবা বেঁচে থাকত!’
‘মা, বাবা তো বেঁচেই আছে!’ রসকষহীনভাবে জবাব দিলো সাজিদ। এই কথা শুনে জিভে কামড় দিলেন সাজিদের মা। বললেন, ‘ধুর বোকা! এ তো কথার কথা!’
সাকিব আহমেদের গল্প “আবার নয়নরাঙা”
সাজিদের মা বাংলা সিনেমার খুব বড় ভক্ত। প্রচুর বাংলা সিনেমা দেখেন তিনি। দেখতে দেখতে এক সময় হারিয়ে যান। আর সুযোগ পেলেই কথার কথার মতো করে সেসব বাংলা সিনেমার ডায়লগ বলতে থাকেন। তার এসব কথার কথা মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে সাজিদের। কেননা, মায়ের এসব অনেক কথার সাথেই পরিস্থিতির মিল পায় না সে।
সাজিদের রেজাল্ট শুনে ব্যাপক খুশি তার মা। কিন্তু তিনি জানেন না তার ছেলে আসলে ভালো রেজাল্ট করেছে না, খারাপ রেজাল্ট করেছে। এসব বুঝতেও চেষ্টা করছেন না তিনি।
সাজিদের বাবাকে ডাক দিলেন, ‘ওগো শুনছ? তোমার ছেলে রেজাল্ট করেছে…’ কিন্তু কত করেছে তা বেমালুম ভুলে গেছেন। সাজিদের কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত জানি রেজাল্ট?’
সাজিদও কানে কানে জবাব দিলো, ‘থ্রি পয়েন্ট নাইন ফোর।’ এবার মা গলা চড়িয়ে বললেন, ‘থ্রি পয়েন্ট নাইন ফোর পেয়েছে তোমার ছেলে।’
সাকিব আহমেদের গল্প “অনলাইন এক্সাম”
রেজাল্ট শুনে খুশি হয়নি সাজিদের বাবা। তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, ‘এসব থ্রি পয়েন্ট পেয়ে কি হবে? জিপিএ ফাইভ পেয়েছে? জিপিএ ফাইভ ছাড়া কি করবে? কতবার বলেছি, মন দিয়ে পড়তে। তা না বাবু সাহেবের হাতে খালি ফোন আর ফোন। রেজাল্ট ভালো হবে কি করে?’
‘বাবা,’ প্রতিবাদ করল সাজিদ। ‘আমি ভার্সিটিতে পড়ি। কলেজে নয়। আমার জিপিএ ফাইভ নাই। আমার সিজিপিএ ফোর আছে। আর এই ফোরের মধ্যে ‘থ্রি পয়েন্ট নাইন ফোর পেয়েছি। আর তুমি যেই ফোন নিয়ে এত কথা বললে, আমি সেই ফোন দিয়েই অনলাইন ক্লাস করে এই রেজাল্ট করেছি। সবাইকে জিজ্ঞেস করো এর থেকে ভালো রেজাল্ট কে করবে?’
সাজিদের কথা শুনতে নারাজ তার বাবা। ‘তাও আরেকটু পড়াশোনা করলে আরও ভালো রেজাল্ট হতো।’ আগের মতোই গজগজ করতে থাকলেন তিনি।
বাবাকে বুঝিয়ে লাভ হবে না, তাই নিজের ঘরে ফিরে এলো সাজিদ। দরজা বন্ধ করে দিলো ভিতর থেকে। বিরক্ত লাগছে তার। বড়রা এমন কেন হয়? কিছুই বুঝতে চায় না! সবসময় নিজেরা যা বলবেন তাই যেন ঠিক!
‘সিজিপিএ ফোর পেলেও বলবে পড়াশোনা ঠিক মতো করলে আরও ভালো রেজাল্ট হতো! কোনোকিছুতেই মন ভরবে না তাদের।’ নিজের মনে একা একা কথা বলে যেতে লাগলো সাজিদ। ‘আর কোনও কিছু হলেই ফোনের দোষ। ঘুমাতে দেরি হচ্ছে, ফোনের দোষ, কিছু নষ্ট হলেও ফোনের দোষ। সব দোষ যেন এই ফোনের। আমার অবলা ফোনটাকে কত অপমান করে!’ বলে ফোনের গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো। যেন আদর করছে।
হঠাৎই বাইরে থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। হইচই, হট্টগোল শোনা যাচ্ছে। এত চিৎকার চেঁচামেচি কিসের? ভাবছে সাজিদ। নিজের ঘরের সাথে থাকা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে বেশকিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির সামনের কাঁচের উপরে টিভি চ্যানেল, নিউজপেপারের লোগো।
‘মিডিয়া আমাদের বাসার সামনে কি করছে?’ মনে মনে ভাবছে সাজিদ। কৌতূহলবসত বেলকনি থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। ‘উফ! আবার কে আসলো?’ কিছুটা বিরক্ত হলো সে। কেউ এসেছে বলে নয়, কি ঘটছে বাইরে তা বুঝতে পারছে না বলেই বিরক্তিটা বেশি।
হইচইটা এখন বেশি শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাছে পিঠেই কিছু ঘটেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে এই হই-হট্টগোলের উৎস খুঁজছিলো সাজিদ। চমকে উঠলো নিজের ঘরের দরজায় থাবা পরার আওয়াজে। কে এভাবে থাবা দিচ্ছে? দরজা ভেঙে ফেলবে যেন!
মায়ের গলা শুনতে পেলো সাজিদ। ‘সাজিদ, দরজা খোল।’
কি ব্যাপার হলো? মা এভাবে ডাকছে কেন? আবার এভাবে দরজায় এত জোরে ধাক্কা দিচ্ছে কেন। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলল সাজিদ।
‘কি হয়েছে, মা?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘তোর সাথে কথা বলতে কয়েকজন সাংবাদিক আসছে।’ রাগান্বিত স্বরে বললেন সাজিদের মা।
‘আমার সাথে? সাংবাদিক?’ অবাক হয়ে বলল সাজিদ। ‘আমি কি করেছি?’
‘সে তো তুই-ই বলতে পারবি।’ কড়া জবাব দিলেন মা। চোখের তাপে যেন ছেলেকে ভস্ম করে দিবে।
‘আমি তো কিছুই জানি না।’ বলল সাজিদ। ‘চলো তো দেখি, ঘটনা কি?’
মায়ের সাথে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সাজিদ। সাংবাদিকদের সামনে এসে দাঁড়ালো। সাজিদকে পেয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো সাংবাদিকদের সাথে থাকা ক্যামেরাম্যানদের শরীরে। একের পর এক ছবি তুলতে লাগলো তারা। ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় চোখ ধাধিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা!
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাড়িয়ে আছে সাজিদ। কিছুই বুঝতে পারছে না কি ঘটছে। কিছু যে জিজ্ঞেস করবে, সেই সাহসটাও পাচ্ছে না। অবশেষে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করল, ‘সাজিদ, আপনি যে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়ে এতো ভালো রেজাল্ট করলেন! আপনার অনুভূতি কি?’
ওহ! তাহলে এই ব্যাপার। সাংবাদিকরা সাজিদের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে। এই সাক্ষাৎকার বড় আকারে ছাপা হবে নিশ্চয়ই। সাজিদের এখন নিজেকে বিশাল কেউকেটা গোছের কেউ মনে হচ্ছে। এদিকে সাজিদের বাবা-মা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ যেন বুঝতে পারছে না, আসলে ঘটছে টা কি?
‘আপনার এমন ভালো রেজাল্টের রহস্য কি?’ আরেক সাংবাদিকের প্রশ্ন।
আরেকজন বলল, ‘আপনার এই অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করুন।’ এভাবে একের পর এক প্রশ্ন ধেয়ে আসতে লাগলো সাজিদের দিকে।
প্রথম দিকের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব কাটিয়ে একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলো সাজিদ। সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নের বাণে জর্জরিত হতে লাগলো সে। যেন প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসেছে সাংবাদিকরা।
অবশেষে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলো। সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলো সব সাংবাদিক। আর সাজিদ? বাবা-মার সামনে দিয়ে রাজকীয়ভাবে হেঁটে নিজের রুমে ফিরলো। এখন তাকে আর পায় কে? কিছুদিনের মধ্যেই সে সেলিব্রেটি হয়ে যাবে!
পরের দিন সকাল… বাসায় আসা নিউজপেপারের প্রথম পাতায় বড় করে সাজিদের ছবি। নিজের লেখা, “স্ক্রিনের আলোয় পড়াশোনা করে সিজিপিএ তিন দশমিক নয় চার পেলো সাজিদ মাহমুদ।”
নিজের নাম আর ছবি দেখে যেন বাড়ি মাথায় তুলছে সাজিদ। সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাচ্ছে। আর মনে মনে নিজেকে নিয়ে গর্ব করছে!
হঠাৎ মুখে পানির ছোঁয়া অনুভব করল। ব্যাপার টা কি হলো? বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে? বাসার ছাদ ফুটো হয়ে গিয়েছে নাকি? পানি পড়ছে কোথা থেকে?
এমন সময় মায়ের কণ্ঠ কানে এলো তার। ‘ওরে নবাবজাদা, আর কতো ঘুমাবি। কয়টা বাজে? সারাদিন খালি ঘুম আর ঘুম!’ চিৎকার করে বললেন মা।
লাফ দিয়ে নিজের বিছানায় উঠে বসল সাজিদ। আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি ঘটছে। হাতে কোনও নিউজ পেপার নেই। আর সাজিদেরও রেজাল্ট ও থ্রি পয়েন্ট নাইন ফোর হয়নি। অর্থাৎ সবটাই স্বপ্ন ছিল সাজিদের।
মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো সে। মায়ের হাতে পানির জগ। ঘুম থেকে উঠছিল না বলে পানিকেই হাতিয়ার বানিয়েছে মা।
‘এভাবে কি দেখছিস?’ বললেন মা। ‘তোর স্যার ফোন দিয়েছিলেন। ফোন তো বাজছে সেই কখন থেকে, আমি রিসিভ করলাম। তুই তো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস। তোর নাকি আজকে অনলাইন ক্লাস আছে?’
সাকিব আহমেদের গল্প “বিজয়োল্লাস”
হ্যাঁ তাইতো! আজ তো গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস ছিল। একদম ভুলে গিয়েছিল সাজিদ।
‘পড়ার ব্যাপারে কোনও চিন্তা নাই।’ মা বলে যেতে লাগলেন। ‘ফাঁকিবাজ দেখেছি, তোর মতো দেখিনি। বাসায় বসে ক্লাস, তাতেও ফাঁকিবাজি! ভার্সিটি তে যেয়ে যে তুই কি করিস আল্লাই ভালো জানে!
মায়ের কথায় কান না দিয়ে ল্যাপটপ অন করল সে। একটা বিশাল হাই তুলে অনলাইন ক্লাস জয়েন করল। ওদিকে গজগজ করতে করতে নিজের কাজে ফিরে গেল মা।
সাজিদ ভাবছে, ক্লাস শেষ করে আবার ঘুমাতে হবে। যেই বিষয় বাস্তবে সম্ভব না, তা স্বপ্নেই সুন্দর, স্বপ্নেই মধুর। জেগে থেকে মানুষের কথা শোনার চেয়ে ঘুমানো ভালো! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন দেখা যায়, আবার সেই স্বপ্নে সেলিব্রেটি হওয়া যায়….
সাকিব আহমেদের গল্প “বাঙালীয়ানা”
পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
সাকিব আহমেদের গল্প “স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ”

