এক পৃথিবী হতাশা | তিথি রায় পূজা


bdnews24 bangla newspaper, bangladesh news 24, bangla newspaper prothom alo, bd news live, indian bangla newspaper, bd news live today, bbc bangla news, bangla breaking news 24

সারা রাত মায়ের সাথে গল্প করে ভোরের দিকে ঘুমোতে গেলো অথৈ। মাকে বলে দিয়েছে, কাল সকালে ঢাকা ফেরার সময় মা যেনো একটুও কান্নাকাটি না করে। কলেজে ভর্তির পর থেকে তার হোস্টেল জীবন শুরু। প্রায় ছয়/সাত বছর হয়ে গেছে। তবুও প্রতিবার ঢাকা যাবার সময় মা মরাকান্না জুড়ে দেয়। অথৈ নিজেকে খুব শক্ত এবং বাস্তববাদী ভাবে সকলের সামনে উপস্থাপন করলেও আসলে সে প্রচণ্ড ইমোশনাল একটা মেয়ে। কারোর সামনে কাঁদতে পারেনা। কারো সামনে নিজের আবেগগুলো উপস্থাপন করতে পারেনা। সে কাঁদে একা একা। তার সব কান্নাকাটির একমাত্র সাক্ষী হলো তার বালিশ। চোখের জলে নীরব ইতিহাস লেখে বালিশে। সেই বালিশই জানে মেয়েটার মনের মাঝে থাকা ব্যথা, বেদনার কাব্য।

তিথি রায় পূজার গল্প “নারীর দৃঢ়তা”

মা’য়ের কান্না দেখে প্রতিবারই সে মা’কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরে, ওড়নার আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির বাইরে পা রাখে। কিন্তু এবারের ঢাকা যাওয়া টা অন্যান্য বারের মতো নয়। এবার টানা সারে চার মাস বাড়িতে বন্দী জীবন কাটিয়ে ঢাকা ফিরছে অথৈ। লকডাউনের সেই ঐতিহাসিক দমবন্ধ দিনগুলো……..

ঢাকা ফেরার আগের দিন মা মেয়ে মিলে গল্প করে কাটিয়ে দেয় সারা রাত। বয়সের একটা সময় এসে বেশির ভাগ মা মেয়েরাই সম্ভবত বন্ধু বনে যায়। তাই অথৈ আজ অগ্রিম বলে দিয়েছে, কাল যেনো হাসিমুখে মা তাকে বিদায় দেয়। এবং সে নিজেও কাঁদবেনা ঘোষণা দিয়েছে। বলা মাত্রই মা মেয়ে খিলখিল করে হেসে দিলো।

এবার অথৈ বললো, ‘মা শোনো আমার বিয়ে তে যতোই ওয়াটারপ্রুফ মেকআপ করিনা কেন, তখনও কিন্তু আমি কাঁদবোনা বলে দিলাম। কান্নাকাটি করতে গেলে ফটোশ্যুটের মুড হারিয়ে ফেলবো। বিয়ে তো জীবনে একবারই করবো নাকি। সাজগোজ আর ফটোশ্যুট ছাড়া চলে বলো? আর তুমিও একদম কান্নাকাটি করবেনা। নইলে বরপক্ষ এবং কনেপক্ষ সবাই মিলে একসাথে বলাবলি করবে বউ কাঁদেনা, অথচ বউয়ের মা চোখের পানির সাগর বানিয়ে ফেলেছে। শুধুশুধু আমার বদনাম করবেনা কিন্তু মা বলে রাখলাম।’ এবার মা মেয়ে দুজনেই দ্বিগুণ শব্দে হেসে ফেললো।

পাশের রুম থেকে অথৈয়ের বাবা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘মেয়ে না হয় ছোটোই আছে, মেয়ের মা ও কি মেয়ের সাথে ছোটো হয়ে গেলো নাকি? রাত বাজে সাড়ে তিনটা, এখনো ঘুম বাদ দিয়ে মা মেয়ের গল্প চলছে?”

কি আর করার! বাবার হুংকারে অগত্যা ঘুমোতে গেলো মা মেয়ে। পরদিন সকাল নয়টায় ঢাকাগামী বাস অথৈয়ের।

তিথি রায় পূজার গল্প “কোয়ারেন্টাইন ডায়েরি”

প্রতিবারের মতোই মা তাকে একগাদা খাবার দাবার সহ বড় বড় কয়েকটা ব্যাগ বানিয়ে দিয়েছে। প্রতিবারের মতো মা-মেয়ে কান্নাকাটি করে বিদায় নিলো। প্রতিবারের মতো এবারো অথৈ দেখলো বাস ছাড়া মাত্রই বাবা শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলন্ত বাসের দিকে তাকিয়ে আছে। এবং প্রতিবারের মতো এবারো পনেরো মিনিট পরপর বাবা ফোন দিয়ে অথৈয়ের খবর নিচ্ছে। প্রায় ছয়/সাত ঘণ্টা জার্নি করে অথৈ ঢাকায় পৌঁছালো। ছোটো আঙ্কেল বাস স্ট্যান্ডে এসেছে তাকে নিতে।

১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই “নীল আর্মস্ট্রং” ও চাঁদে প্রথম অবতরণ করে এতোটা খুশি হয়নি, যতোটা অথৈ ২০২০ সালের আগস্টে প্রায় সারে চারমাস পরে ঢাকার মাটিতে পা রেখে খুশি হলো!

ঢাকায় ফেরা মাত্রই অথৈকে আর পায় কে! কতোদিন সে রোদে পুড়ে পুড়ে ঘুরে ঘুরে শপিং করেনা, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের খাবার দাবার এক্সপ্লোর করেনা, ভার্সিটিতে যায়না, ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দেয়না!

রবীন্দ্র সরোবরের মালাই চা, টি.এস.সি’র তেঁতুল চা, রাস্তার ভ্যানগুলোর ফুচকা, ভেলপুরি, চটপটি, ঝালমুড়ি, মোরের টং দোকানের চা, শংকরের খিচুড়ি, শ্যামলী পার্কের ছোট্টো সিঙারা, আর ভাজি পুরি, সব খুব মিস করেছে এতোদিন।

প্রতিবার ঢাকায় ফেরার পর প্রায় সপ্তাহখানেক হোমসিকনেসে দিন কাটে অথৈয়ের। মা তার বেস্ট ফ্রেন্ড। মা-মেয়ে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো শেয়ার করে। তাদের বেশিরভাগ কথার টপিক- আজ অমুক বার, গত সপ্তাহর অমুকবারে এটা করেছিলাম/ওটা হয়েছিলো টাইপ!

কিন্তু এই প্রথম বার ঢাকা ফিরে মা বাবার জন্য মন খারাপ লাগলেও ততোটা হোমসিকনেস ফিল করছেনা অথৈ। দীর্ঘদিন বাড়িতে থেকে এসে, মনে হচ্ছে এক যুগ পর ঢাকায় ফিরেছে। আর তাই জাদুর শহর ঢাকার যন্ত্রণাময় যান্ত্রিকতা ও তার ভালো লাগছে। একটা সময় যা বিরক্তির কারণ ছিলো, আজ যেনো তাতেই স্বস্তি!

রাতে খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পরলো অথৈ। ঘুমোতে হবে, কারণ পরের দিন সকাল নয়টায় ক্লাস আছে। অথচ ঘুমাতে ঘুমাতে রাত সারে তিনটা বেজে গেলো অথৈয়ের।

তিথি রায় পূজার গল্প “সিভিয়ার ক্রাশ”

ঘুম ভাঙলো পরদিন সকাল সারে নয়টায়!

ঘুম থেকে উঠে তার মনে হলো, নাহার ম্যামের প্রথম ক্লাসটাই তো মোস্ট ইম্পরট্যান্ট ছিলো। সাথে এতদিন পর সবাই আজ ভার্সিটিতে যাবে। একটা ছোটোখাটো পূণর্মিলনি হয়ে যাবে। সেটাও হলো না। যাই হোক, তাহলে পরের ক্লাস করতে আর ভার্সিটি যেয়ে কাজ কি! আজ তো এমনিতেই টাইট শিডিউল। লাঞ্চের পর ল্যাব আছে। বিকেলে নাহয় একবারে ভার্সিটি তে গিয়ে ল্যাবেই সবার সাথে দেখা সাক্ষাত করা যাবে। ব্যাচের একদল অবশ্য ল্যাব না করে থিসিস করছে। তাদের সাথে তেমন বন্ধুত্ব নেই অথৈয়ের। দেখা হলে কেবল হাই-হ্যালো পর্যায়ের সম্পর্ক। তাই একবারে ল্যাবের টাইমে ভার্সিটি যাওয়াই ডিসাইড করলো সে।

কতোদিন শপিংয়ে আর রেস্টুরেন্টে যাওয়া হয়না। সকালে শপিংয়ে যেয়ে দুপুরে একবারে বাইরে লাঞ্চ সেরে তারপর ভার্সিটিতে গেলে মন্দ হয়না, ভাবলো অথৈ।

বেস্ট ফ্রেন্ড প্রিয়ন্তি কে ফোন করলো পরিকল্পনার জানাতে। প্রিয়ন্তি ফোনটা রিসিভ না করে কেটে দিলো। অথৈ ভাবলো, ম্যাম ক্লাসে তাই হয়তো কেটে দিয়েছে। এদিকে প্রিয়ন্তি ভাবলো অথৈ বোধহয় ভার্সিটিতে এসেছে, ক্লাস কতো নাম্বার রুমে জানেনা তাই ফোন দিয়েছে। প্রিয়ন্তি একটা টেক্সট করলো অথৈকে- ‘১০০১ নাম্বার রুমে ক্লাস চলছে, তাড়াতাড়ি চলে আয়।’

অথৈ রিপ্লাই দিলো- ‘ক্লাস শেষে ফোন দিস, আজ ক্লাস করবোনা।’

এরপর ফোন চার্জে দিয়ে ওয়াশরুমে গেলো অথৈ। ফ্রেশ হয়ে এসে রুমমেট শিখাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো৷ বায়না ধরলো শপিংয়ে যাবার। শপিং শব্দটির সাথে বেশিরভাগ মেয়েরই আবেগ জড়িয়ে থাকে। তাই আর বেশি জোরাজুরি করতে হলোনা শিখাকে।
অথৈ আর শিখা রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লো শপিং এর উদ্দেশ্যে। মাত্র পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। তাই ঢাকার জ্যাম টাও তুলনামূলক কম। অথচ বাসায় অলস বসে থেকে, আধঘণ্টার রাস্তা তিনঘণ্টায় পারি দেওয়া সেই দূর্বিসহ জ্যাম টাকেও মিস করেছে অথৈ।
ধীরে ধীরে জাদুর শহর ঢাকা তার পুরাতন রূপ ফিরে পাচ্ছে…..

অথৈ আর শিখা একটা শাড়ির শোরুমে ঢুকেছে। এটা দেখান, ওটা দেখান বলতে বলতেই আনমনে অথৈ ভাবছে, নাহার ম্যাম নিশ্চয়ই আজ একটানা ডবল ক্লাস নিয়েছে। তাই বোধহয় প্রিয়ন্তির ফোন ব্যাক করতে লেট হচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই প্রিয়ন্তি ক্লাস শেষ করে কল ব্যাক করেছে অথৈ কে।

তিথি রায় পূজার গল্প “রোদেলা রোদ্দুর”

অথৈ: হ্যালো বল দোস্ত, আমি তো শাড়ি কিনতে এসেছি শিখার সাথে।
প্রিয়ন্তি: কোথায় আছিস?
অথৈ: বেনারসি পল্লী তে।
প্রিয়ন্তি: কেন? লকডাউনে বাসায় থেকে কি বিয়ে টিয়ে ঠিক করে আসলি নাকি? জানাসনি তো কিছুই!
অথৈ: ধ্যাত্তেরী, সবসময় শুধু ফাইজলামি তোর। বিয়ের বেনারসি কিনতে আসিনি। অনলাইনে একটা জামদানী খুব পছন্দ হয়েছিলো তাই।
প্রিয়ন্তি: কোনটা? কাল যেই স্কাই ব্লু শাড়ির ছবিটা ম্যাসেঞ্জারে দিয়েছিলি সেটা? তো অনলাইনেই অর্ডার করলেই হতো?
অথৈ: না অন্য একটা, অফহোয়াইট কালার। ভাবলাম অনেকদিন শপিংয়ে যাইনা, তাই অনলাইনে অর্ডার করিনি।
প্রিয়ন্তি: দোস্ত আমারও দমবন্ধ লাগছে। নেক্সট ক্লাস করবোনা ভাবছি, আমিও বাদ দেই। তুই থাক, আমি বেনারসি পল্লী তে আসছি। রাস্তায় আজ জ্যাম অনেক কম।
অথৈ: সত্যি আসবি দোস্ত, আয় আয়। দুপুরে তাহলে একসাথে লাঞ্চ করে ল্যাবে যাবো, কেমন?
প্রিয়ন্তি: ওকে দোস্ত, বাই….

প্রায় আধ ঘণ্টার মধ্যেই প্রিয়ন্তি চলে এলো। এর মধ্যে শিখা একটা পেস্ট কালারের কাতান শাড়ি কিনে ফেলেছে। প্রিয়ন্তি আসার পর তিনজনে মিলে প্রথমে রাস্তার ধারে দাড়িয়ে ফুচকা আর টং দোকানের চা খেলো। তারপর অথৈ ওর পছন্দ করা সেই জামদানী শাড়িটা কিনলো। কিনবে কি কিনবেনা করেও শেষ পর্যন্ত প্রিয়ন্তিও কচি কলাপাতা রঙের একটা হাফসিল্ক শাড়ি কিনে ফেললো।
রঙটা রুদ্রর খুব পছন্দ।

লকডাউনে সবাই এতদিন বাড়িতে ছিলো। প্রিয়ন্তির ছোটোবোন রংপুর মেডিকেলে পড়ে। সেও হল ছেড়ে বাড়িতে চলে এসেছিলো। দুইবোন একরুমে থাকতো বলে প্রিয়ন্তি খুব একটা ফোনে কথা বলতে পারতোনা রুদ্রর সাথে। তাই মান ভাঙানোর জন্য প্রিয়ন্তি রুদ্রর পছন্দের রঙের এই শাড়িটাই কিনলো। বাড়িতে বলবে পরের দিন ভার্সিটি তে প্রেজেন্টেশন আছে। আর এটা বলে শাড়িটা পরে বাড়ি থেকে বের হবে প্রিয়ন্তি। কারণ কাল প্রায় পাঁচমাস পর রুদ্রর সাথে দেখা করার কথা।

তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু -দ্বিতীয় অধ্যায়”

সত্যি কথা বলতে কি, এই রঙটা প্রিয়ন্তির খুব একটা পছন্দ না। তবু শুধুমাত্র রুদ্রর পছন্দ বলেই কিনেছে। কিন্তু এটা সে অথৈয়ের কাছে ধরা দিলোনা। কারণ গত বছর রুদ্রর জন্মদিনের আগের দিন প্রিয়ন্তি অথৈ কে ফোন দিয়েছিলো। রুদ্রকে কি করে চমকে দেয়া যায় পরামর্শ নিতে। কিন্তু অথৈ যা সব কথা বার্তা বললো তা শুনে খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো প্রিয়ন্তির!

তাদের কথোপকথন ছিলো কিছুটা এমন-
প্রিয়ন্তি : হ্যালো অথৈ, একটা হেল্প করবি দোস্ত?
অথৈ : ব্যালান্স নাই!
প্রিয়ন্তি : উফ্ আমি কি প্রতিদিন রুদ্রর সাথে ঝগড়া করি? আর প্রতিদিন কি তোকে বলি যে রুদ্র কে ফোন দিয়ে আমাদের মিল করে দে?
অথৈ : তো? এছাড়া তোর আবার কি হেল্প লাগবে আমার থেকে?
প্রিয়ন্তি : কাল রুদ্রর জন্মদিন। ২৫০০টাকা দিয়ে একটা শার্ট কিনেছি আজ রাপা প্লাজা থেকে। কিন্তু বুঝতে পারছিনা ওর পছন্দ হবে কিনা!
অথৈ : আঙ্কেলকে জীবনেও ২৫০০টাকা দিয়ে শার্ট কিনে দিয়েছিস?
প্রিয়ন্তি : না!
অথৈ : জীবনে আঙ্কেল আন্টিকে কিছু কিনে দিয়েছিস?
প্রিয়ন্তি : না তো!
অথৈ : আঙ্কেল কি ২৫০০ টাকার শার্ট পরে?
প্রিয়ন্তি : না তো! কেন?
অথৈ : তো তোর এতো বছরের বাবা মা’কে জীবনেও কিছু কিনে দিসনি। মা বাবা পার্মানেন্ট তাই ফিউচারে জব পেয়ে কিনে দিবি, তাই তো? আর টেম্পোরারি বলে কি বয়ফ্রেন্ডকে হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে গিফট কিনে দিচ্ছিস?
প্রিয়ন্তি : আমি তোর কাছে বুদ্ধি নিতে ফোন দিলাম কি করে ওকে চমকানো যায়৷ আর তুই এতগুলো কথা শুনিয়ে দিলি দোস্ত? লাগবে না আমার তোর হেল্প।
অথৈ : রাগ করিস কেন, তুই ফ্যান্টাসিতে আছিস দোস্ত, তাই আমি তোকে বাস্তবতা বুঝাতে চেষ্টা করলাম। আবেগ আর বাস্তবতা এক জিনিস না রে!
প্রিয়ন্তি : শোন দোস্ত, এক মাঘে কিন্তু শীত যায়না, তুই আর কতো কাল সিঙ্গেল থাকবি? ফিউচারে আমিও দেখে নিবো তোকে….!

অথৈ মেয়েটা খুব বেশি পরিবার কেন্দ্রিক। তার মতে আজ কাল কার প্রেম গুলো সকাল বিকেল টাইপ। এই আছে এই নেই। কিন্তু মা বাবা তো সারাজীবনের জন্য। দুইদিনের প্রেমে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এতো লাফালাফির কি আছে সেটাই নাকি তার মাথায় ঢোকেনা৷

আসল কথা হলো, এখন পর্যন্ত কাউকে দেখেই সিরিয়াসলি মন হারানোর মতো ব্যাপার ঘটেনি তার জীবনে। তাই না সে এসব বোঝে আর না এসব পাত্তা দেয়।

এমন না যে অথৈ কে কেউ কখনো প্রপোজ করেনি! যারাই ওকে প্রপোজ করেছে ও খুব সোজাসুজি প্রত্যেক কে একই উত্তর দিয়েছে- বিয়ের আগের প্রেমে আমি বিশ্বাসী নই। বিয়ের পরে নিজের স্বামীর সাথে প্রেমে আমি বিশ্বাসী। বাবা মা যার সাথে আমার বিয়ে দিবে, তাকেই চোখ-বন্ধ করে আমি বিয়ে করে ফেলবো!

বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান হলে বোধহয় এমনই পরিবারকেন্দ্রিক হয়! আর তাই অথৈও বোধহয় তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

তিথি রায় পূজার গল্প “প্রথম দেখার গল্প”

অতঃপর শাড়ি কেনা পর্ব শেষ হলে তিনজনে মিলে ধানমন্ডির এক রেস্টুরেন্টে এলো। লাঞ্চ সেরে শিখা তার নিজের আর অথৈয়ের শাড়ির প্যাকেট দুটো নিয়ে হোস্টেলে ফিরে গেলো। আর অথৈ প্রিয়ন্তি দুজন মিলে ভার্সিটি তে গেলো। ল্যাব শেষে তারা কয়েকজন ফ্রেন্ড মিলে ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় চা আর পুরি নিয়ে আড্ডায় বসলো। অথৈ পুরি খাবেনা, ওর পছন্দ ভেলপুরি। অনেকদিন খায়না। কিন্তু প্রিয়ন্তি জোড় করে আধটা পুরি অথৈয়ের মুখে পুরে দিলো। চা পুরি পর্ব শেষ করে অথৈ বলে- চল রবীন্দ্র সরোবরে যাই কতো দিন যাইনা। লাস্ট কবে গেছিলাম সেটাও তো ভুলে গেছি। প্রিয়ন্তি হেসে বলে ‘তুই কি একদিনেই সব মিসিং গুলো ফিলআপ করবি নাকি?’

দুজনেই হাসতে হাসতে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে রিক্সা নিলো৷ সরোবরে যেয়ে তারা এখন সপ্তাহের বাকি প্লানিং গুলোর শিডিউল রেডি করবে…..

হুট করে মায়ের চিল্লাচিল্লি শুনতে পেয়ে আবাক হলো অথৈ। এখানে মা কি করে আসবে? এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই চিল্লাচিল্লি আরও স্পষ্ট হলো৷ ধড়মড়িয়ে উঠে বসল অথৈ। আশেপাশে প্রিয়ন্তিকে খুঁজছে। কিন্তু প্রিয়ন্তি কোথায়? কোথাও তো কেউ নেই। শুধু যা আছে, তা হলো মায়ের চিল্লাচিল্লি। এর অর্থ এতোক্ষণ যা ছিল সবই স্বপ্ন!
তার মানে লকডাউন এখনো শেষ হয়নি? আর সে ও ঢাকায় ফিরে যায়নি, বাড়িতেই রয়েছে! এখন বেলা সারে এগারোটা। কখন ব্রেকফাস্ট করবে, প্রতিদিন কেন দেরী করে ঘুম থেকে ওঠে, কেন সবসময় মোবাইল নিয়ে পরে থাকে, মায়ের এসব চেঁচামেচিতে সে জেগে গিয়েছে।

তারপর হুট করে মনে হলো, আচ্ছা বাবা এই টাইমে বাসায় কেন? আজ কি তবে শুক্রবার নাকি! কিছুক্ষণ বাদে মনে পড়লো, এখন তো তার কাছে সপ্তাহের সাত দিনই শুক্রবারই। গৃহবন্দী জীবন যাপন।

পহেলা বৈশাখ, রমজান ঈদ, ফাদার্স ডে, এমনকি কোরবানির ঈদ সব গৃহবন্দী ভাবেই কাটলো এবার। অভিশপ্ত একটা বছর এই ২০২০ সালটা! বিশ সাল তো নয় বিষ সাল হয়েই কাটছে বছর টা।

তার মানে পৃথিবী এখনো সুস্থ হয়নি!
স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি।
হয়নি অথৈয়ের ঢাকা ফেরা।
কবে যে সব ঠিকঠাক হবে, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানেনা। রয়েছে শুধু-
এক পৃথিবী হতাশা……..

তিথি রায় পূজার গল্প “খুনসুটি”

পেপার’স লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা