‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে, জেনে যাবে কেউ জেনে যাবে’ – ফুল ভলিউমে উজ্জ্বলের স্পিকারে বাজছে গানটা। এই গানের মধ্যে একটা ফিল আছে। এই ফিল নিয়ে নিজেই ঘরে ল্যাপটপ অন করে অপেক্ষা করছে উজ্জ্বল।
আজ উজ্জ্বলের অনলাইন পরীক্ষা। এই পরীক্ষা নিয়ে খুব এক্সাইটেড ফিল করছে উজ্জ্বল। জীবনে প্রথমবার অনলাইনে পরীক্ষা দিবে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশ করবে! ভাবতেই কেমন যেন রোমাঞ্চ অনুভব করছে সে।
সময় যেন কাটে না! পরীক্ষা শুরু হতে আরও ১৫ মিনিট বাকি। পরীক্ষার হলে জীবনেও ১৫ মিনিট আগে পরীক্ষা দিতে যেত না উজ্জ্বল। বরং পাঁচ/সাত মিনিট দেরি হলেও তার অসুবিধা হতো না। আজ দৃশ্যপট ভিন্ন। কারণ আজ অনলাইন এক্সাম। ল্যাপটপ অন করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছে সে।
উজ্জ্বলের পড়নে আছে একটি লুঙ্গি আর একটি পাতলা গেঞ্জি। উজ্জ্বল ভেবেছিল, যেহেতু পরীক্ষা! তাই জিন্স আর মোটামুটি ভালো মানের টি-শার্ট পড়ে পরীক্ষা দিবে। কিন্তু যেই গরমের গরম! লুঙ্গি আর পাতলা গেঞ্জি ছাড়া উপায় নেই।
সাকিব আহমেদের গল্প “বিজয়োল্লাস”
এই গেঞ্জি নিয়ে উজ্জ্বলের মায়ের অনেক অভিযোগ। এইটা নাকি ঘর মোছার কাপড়ের চেয়েও বাজে। পুরনো হয়ে গেছে। বারবার ফেলে দিতে বললেও উজ্জ্বল ফেলে না। তার গার্লফ্রেন্ড এই গেঞ্জি তাকে উপহার দিয়েছিল। তাই এটি পড়লে অন্যরকম ফিল আসে।
সেই ফিল নিয়েই পরীক্ষা দিতে বসেছে উজ্জ্বল। না না, বসে নেই। উজ্জ্বল এখন শুয়ে আছে পরীক্ষার অপেক্ষায়।
একটি ‘টুং’ শব্দে লাফ দিয়ে উঠলো উজ্জ্বল। ম্যাসেঞ্জারে প্রশ্ন দেওয়া হয়ে গেছে। এই পরীক্ষা খুব ইন্টারেস্টিং।
একঘণ্টা সময় দেওয়া হবে দশ মার্কস উত্তর দেওয়ার জন্য। বাকি ২০ মার্কসের জন্য উজ্জ্বল সময় পাবে পুরো একটা দিন। ভাবা যায়!
কিন্তু উত্তরপত্র কিভাবে পাঠানো হবে? সেই বিষয়টাও খুব ইন্টারেস্টিং। ছবি তুলে মেইল করতে হবে। যেই ইন্টারনেট আগে কাজের চেয়ে অকাজেই ব্যবহৃত হতো বেশি, সেই ইন্টারনেট এখন কাজের জন্য ব্যবহার হচ্ছে।
সে যাই হোক! উজ্জ্বল এখন খুব ব্যস্ত পরীক্ষা নিয়ে। টপাটপ সব প্রশ্নের উত্তর লিখছে। এই অবস্থায় বাসার কেউ উজ্জ্বলকে দেখলে ভাবতো, ছেলেটা কি পাগল হয়ে গেছে? একবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ বড় বড় করে ল্যাপটপের দিকে চেয়ে আছে! আবার একটু একটু করে লিখছে।
যেহেতু বাসায় পরীক্ষা, কপি করার জন্য কেউ ধরবে না। কিন্তু এক ঘণ্টা খুব কম সময় দেখে দেখে লেখার জন্য। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়, বইপত্র আর ইন্টারনেট ঘেঁটে, তারপর তা দেখতে হয়, আবার লিখতেও হয়। এমন কঠিন অবস্থায় কি করা যায় তার একটা উপায় বের করেছে উজ্জ্বল। একটা চ্যাপ্টার ফোনে, আরেকটা চ্যাপ্টার ল্যাপটপে অন করে রেখেছ। যাতে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময় নষ্ট না হয়।
এভাবেই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ করল উজ্জ্বল। একটা বিশাল হাই তুলে শেষের প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ করল উজ্জ্বল। উজ্জ্বলের এই এক সমস্যা। পরীক্ষা দিতে গেলেই তার ঘুম আসে। আগে পরীক্ষার হলে ঘুম আসতো। খুব ঘুম পাওয়ার পরও ঘুমাতে পারত না। এবার পরীক্ষার উত্তরপত্রের ছবিগুলো মেইল করে একটু ঘুমিয়ে নেবে, ভাবল উজ্জ্বল। বাকি প্রশ্নের উত্তরগুলো পরে লিখে মেইল করা যাবে। যেহেতু ২৪ ঘণ্টা সময় আছে, এখনই না লিখলেও চলবে। বা আজ না লিখলেও চলবে। কাল ধীরে সুস্থে লিখবে না হয়।
যেই ভাবা, সেই কাজ। পরীক্ষা শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে গেলো উজ্জ্বল। উজ্জ্বল এই কাজটা খুব ভালো পারে। যেখানে খুশি, যেভাবে খুশি ঘুমিয়ে যেতে পারে। তার চেয়ে বেশি এই গুণ হয়ত আর কারো নেই।
কিন্তু এখনকার এই ঘুম খুব একটা সুখকর হলো না। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখলো, সে অনলাইনে পরীক্ষা দেখছে। তবে এবারের মতো না। ভিডিও চ্যাটে হচ্ছে সে এক্সাম। ভার্সিটির সবচেয়ে ভয়ংকর ম্যাডাম গার্ডে আছে। ভিডিও চ্যাটে চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এভাবে লেখা যায়? উজ্জ্বল লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন থেকে দেখে লেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই ম্যাডাম দেখে ফেলল যেন। এক বিশাল হুংকার দিয়ে হাত বাড়াল খাতা নিতে। ভিডিও চ্যাটে ল্যাপটপের ভিতর দিয়ে বের হয়ে এলো তার বিশালাকার হাত। উজ্জ্বলের খাতা ধরে টান দিলো। উজ্জ্বল খাতা দিবে না, তাই শক্ত করে চেপে ধরল তার উত্তরপত্র। ম্যাডামও নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে টান দিলো খাতায়। একটি শব্দ, মাঝ বরাবর দুইভাগ হয়ে গেলো উজ্জ্বলের উত্তরপত্র।
এমন ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে লাফ দিয়ে উঠল উজ্জ্বল। আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি ঘটেছে আসলে। যখন বুঝল, যা ছিল সবই স্বপ্ন; তখন একটু নিশ্চিত হলো। এ যেন স্বপ্ন নয়, রীতিমতো দুঃস্বপ্ন।
ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে উজ্জ্বল। ঘামে ভিজে গেছে তার পুরো শরীর। বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যেয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে আবার লিখতে বসল। একটা বড় প্রশ্ন লিখা শুরু করল সে। লিখা শেষ করে রেস্ট নিচ্ছে। ভাবছে থাক এখন আর লিখবে না। কাল সকালে উঠে আরেকটা বড় প্রশ্ন লিখবে। সময় তো অনেক পড়ে আছে।
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ল উজ্জ্বল। উজ্জ্বল যখন আগে পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিতো, তখন তার প্রচণ্ড ঘুম পেতো। এমনও অনেক পরীক্ষা গেছে, যেখানে সে কিছু পারে না। কি উত্তর দিবে কিছুই বুঝছে না। আশেপাশের সবাই খুব মনোযোগে পরীক্ষা দিতো, আর সে বসে বসে দেখত কে কি করছে। এভাবে দেখতে দেখতে এক সময় তার প্রচণ্ড ঘুম পেতো। কিন্তু পরীক্ষার হলে তো আর ঘুমানো যায় না! সেই আক্ষেপ ছিল উজ্জ্বলের। পরীক্ষার মাঝে যদি একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যেতো!
আজকের এই অনলাইনের মাঝে উজ্জ্বলের সেই ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে। পরীক্ষা দিতে গিয়ে ঘুমোতে পারছে সে। মন থেকে চাইলে হয়ত এভাবেই ইচ্ছেগুলো পূরণ হয়। এসব ভাবতে ভাবতে উজ্জ্বল আবার ঘুমিয়ে গেলো।
নাহ্! এবার কোনও ম্যাডাম উজ্জ্বলের স্বপ্নে এসে দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিলো না। নির্বিঘ্নে রাত পার করে সকালে ঘুম থেকে উঠল সে।
ঘুম থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে শেষ প্রশ্নটা লিখতে বসল উজ্জ্বল। লেখার মাঝে সকালের নাস্তাটাও সেরে নিলো সে। আগে পরীক্ষার সময় খিদে লাগলেও খাওয়ার উপায় ছিল না। এখন খাওয়া, ঘুম, গান শোনাসহ সবকিছু করতে পারে। কেউ বাঁধা দেয় না। কেউ পরীক্ষার খাতা নিয়ে টানাটানি করে না।
‘এই, দেখে লিখবে না!’
‘নিজের খাতার দিকে তাকাও।’
‘মোবাইল বের করবে না।’
‘পিছনে মাথা ঘুরালে সামনের সীটে নিয়ে আসবো।’
‘নিজেরা যা পারো, তাই লিখো।’
এসব আর কেউ বলে না। উজ্জ্বলের মনে হচ্ছে সে নিজের রাজ্যে নিজেই রাজা। নিজেই পরীক্ষার হলে গার্ড দিচ্ছে। এসব চিন্তা করার পাশাপাশি লেখাটাও শেষ করল উজ্জ্বল।
পরীক্ষা শেষ! উত্তরপত্রের সবগুলো পেইজ আরেকবার দেখে নিল। এবার ছবি তোলার পালা। ছবি তুলে মেইল করল কোর্স টিচারের মেইল আইডিতে। মেইল করার মাধ্যমে উজ্জ্বলের এক দিন ধরে চলমান পরীক্ষার অবসান হলো।
পরীক্ষা শেষ করে উজ্জ্বল নিজের ডায়েরি বের করে আজকের বিশেষ তারিখ বড় বড় অক্ষরে লিখে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখতে শুরু করল। ভাবছে এই ডায়েরি কোনোদিনও হারাতে দেওয়া যাবে না।
উজ্জ্বল মনে করে, প্রযুক্তি একদিন এমন এক জায়গায় চলে যাবে। যেখানে হয়ত সে সময় স্কুলে যেতে হবে না। বাসায় বসেই পড়াশোনা হবে, পরীক্ষা দেওয়া যাবে। এমন দিন সত্যিই আসবে কিনা জানে না উজ্জ্বল। তবে বিশ্বাস করে এমন দিন একদিন ঠিকই আসবে। হয়ত তার নাতি-নাতনিরা এই দিন দেখতে পারবে।
তখন সে তার নাতি-নাতনিদের এই ডায়েরিটা দেখিয়ে বলবে, ‘দাদু, তোমরা যে অনলাইনে ক্লাস করো, অনলাইনে পরীক্ষা দাও; এসবের প্রচলন হয়েছিল আমাদের যুগ থেকে। আমরাই প্রথম প্রজন্ম, যারা ঘরে বসে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়েছিল।’
তার নাতি-নাতনিরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকবে, আর উজ্জ্বল বর্ণনা করে যাবে তার প্রথম অনলাইন এক্সামের অভিজ্ঞতা।
পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ

