আজ তিয়াশার ডিভোর্স। অথচ এতো আঘাত পাবার পরেও কতো সহজ ও সাবলীল ভাবে একা হাতে সব সামলাচ্ছে। আমার মেয়েটা যে এতোটা সাহসী আর আত্মপ্রত্যয়ী হবে সত্যিই ভাবিনি কখনো।
অনেকেই বলতো, চেহারা তো মায়ের মতোই সুন্দর। কিন্তু কপাল যেনো মায়ের মতো না হয়। অথচ ওরও আমার মতোই পোড়া কপাল হলো। হুট করে আমার অতীতটাও চোখের সামনে ভেসে এলো।
আমি আশা। আমরা দুই বোন। কোনও ভাই নেই। বড়বোনের বিয়ে হয়ে গেছে সাত বছর আগে। পাশের গ্রামেই তার শ্বশুর বাড়ি। স্বামী, দুই ছেলে মেয়ে, দুই ভাসুর ও তাদের পরিবার, এক অবিবাহিত ননদ, আর বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে তার যৌথ সংসার।
যেকোনো পরিবারের ই বাবা যতো গরীবই হোক না কেন, প্রতিটি মেয়েই তার বাবার কাছে রাজকন্যা।
বাবা বড় আপার সব থেকে কাছের বন্ধু ছিলো। আর মা আমার। তাই আমি সবসময় দুষ্টমী করে বলতাম বাবা আমার থেকে আপাকে বেশি ভালোবাসে। আর আপাও বলতো মা নাকি আমাকে বেশি ভালোবাসে। তো বাবার ঘরের বড় রাজকন্যা আমার আপাও যৌথ পরিবারের পরিস্থিতি তে পরে পাকা গিন্নি বনে গেছে।
পড়াশোনার প্রতি আমার বরাবরের অনীহা। কিন্তু বড় আপা বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি বলে সবার খুব ইচ্ছা আমি যেন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করি। যদিও আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারে তা একপ্রকার বিলাসিতাই বটে। কারণ আমার বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। সামান্য কিছু জমি জমার উপর নির্ভর করেই আমাদের সংসার চলে। মা মাঝে মাঝে লোকের কাঁথা সেলাই করে টুকটাক কিছু আয় করে। যদিও সেটা নিতান্তই কম। এই স্বল্প আয়ের সংসার থেকেও আমি মা বাবা কে কিছু কিছু করে টাকা সঞ্চয় করতে দেখেছি। আমাদের বিয়ের জন্য। মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয় ভেবে – আজ যদি আমার একটা ভাই থাকতো, তাহলে এই বয়সে এসে তাদের এতো পরিশ্রম করতে হতোনা।
মাস্টার্সে ভর্তির পরপরই বাবা আমার বিয়ের চেষ্টা চালাতে থাকেন।
কিছুদিনের মধ্যে পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসে। প্রথমবার কোনও পাত্র পক্ষ আমাকে দেখতে আসবে। এর আগে অবশ্য পাড়ার অনেকেই তাদের নিজেদের জন্য বা কোনও না কোনও আত্মীয় স্বজনের জন্য বাবার কাছে আমার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বাবা রাজী হননি।
প্রথম বার পাত্র পক্ষের সামনে যাবো ভাবলেই কেমন যেনো ভয় ভয় লাগছে। শুনেছি পাত্র ঢাকায় পড়াশোনা করেছে। ঢাকায় খুব বড় একটা কোম্পানি তে বড় একটা পোস্টে চাকরী করে। আর অনেক বছর ধরে ঢাকাতেই থাকে। আমার মতো গ্রামের একটা আনস্মার্ট গেঁয়ো মেয়েকে কেন পছন্দ হবে? জানি এখানে আমার বিয়ে হবেনা তবু খুব ভয় ভাব নিয়েই তাদের সামনে গিয়ে বসলাম। শুনেছি এখনো অনেক মেয়েকে দেখতে এসেই নাকি পাত্র পক্ষ হেঁটে দেখাতে বলে, চুল দেখাতে বলে, রান্নাবান্না কি কি পারে এসব বলে। আমার বেলায় কেউ সেসব কিছুই বলল না। শুধু মুরুব্বি গোছের মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা বললেল, ‘তোমার কি চাকরী করার ইচ্ছে আছে মা?’
আমি কিঞ্চিত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উত্তর দিলাম, ‘আসলে তেমন কিছুই ভাবিনি এখনো। এসব ব্যাপারে পরিবারের মুরব্বি দের কথাই মেনে নিবো।’
উনি হেসে আমাকে ভিতরে যেতে বললেন। জানতাম তারা না করে দিবে৷ এবং এটাই স্বাভাবিক। তবুও মা বাবা তো কতো আশা করে আছে। তাদের কথা ভেবে খারাপ লাগছিলো।
কিছুক্ষণ পর জানলাম, আমার ভাবনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তারা আমাকে দেখে খুবই পছন্দ করেছে। বিয়ের দিন পাকাপাকি করে ফেললো। এমন কি আমাকে আংটি পরিয়ে এনগেজমেন্টও সেরে গেলো। সবাই আমাকে বলতে লাগলো, আমার নাকি রাজ কপাল! এতো সুন্দর একটা বর আর ঘর জুটলো। বলা বাহুল্য, আমার হবু বর পিয়াল দেখতে খুব সুন্দর। আমি অবশ্য লজ্জায় খুব একটা ভালো করে তাকাইনি, কিন্তু সবাই বলাবলি করছিলো যে আশাও সুন্দর বরও সুন্দর, খুব মানাবে দুজনকে।
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রথম দেখার গল্প”
পরের শুক্রবারই আমার বিয়ে হয়ে গেলো। এবং ওইদিনই আমাকে উঠিয়ে নেয়াও হলো। অপরিচিত একটা পরিবেশ, অপরিচিত সব মানুষজন। অস্বস্তি লাগছিলো খুব….
পিয়ালরা তিন ভাই, এক বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে বছর খানিক হলো। বাবা পনেরো বছর আগে মারা গিয়েছিল। শুধু বৃদ্ধা মা রয়েছেন। আর পিয়াল বাড়ির ছোটো ছেলে। ভেবেছিলাম তাদের সবাইকে আমি নিজের মা বাবা ভাই বোনের মতোই দেখবো। না চাইতেই এমন একটা পরিবার আমাকে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা, আমি অবশ্যই তার মর্যাদা রাখবো। ভালোবাসায় আগলে রাখবো এই সংসার। আমার সংসার, আমাদের সংসার…..
কিন্তু বিয়ের প্রায় একসপ্তাহ পরেই পিয়াল আমাকে নিয়ে ঢাকা চলে এলো। প্রথমবার আমার ঢাকায় আসা! এখানকার জীবনযাপনের সাথে গ্রামে বেড়ে ওঠা আমি একদমই তাল মেলাতে পারছিলাম না। এভাবে চলতে থাকলো দিন। আমার মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখও দিয়ে দিলো। পিয়াল আমাকে গ্রামে আমার বাবার বাড়িতে রেখে আসলো।
অবশেষে আমার চিরাচরিত চেনা জায়গা আর মা বাবাকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যদিও মন পড়ে থাকতো পিয়ালের কাছেই। ছেলেটার সবই ভালো, শুধু রেগে গেলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রান্না করতে পারেনা বলে আমি ওর জন্য মাছ, মাংস আর শুঁটকি বেশি করে রেঁধে ফ্রিজে রেখে এসেছি। ছোটো ছোটো অনেক গুলো বক্সে সেগুলো রেখে মার্কার দিয়ে লিখে দিয়েছি কোন টা কোন তরকারি। যাতে ওর বুঝতে অসুবিধা না হয়। আর ও শুধু একটু ভাত ফুটিয়ে তরকারি গরম করে নিলেই যেনো হয়ে যায়।
প্রতিদিন রাতে পিয়াল আমাকে ফোন দিয়ে বলতো, ‘তোমাকে ছাড়া বাসাটা ফাঁকা লাগে আশা। পরীক্ষা শেষ হবার পরদিনই বাবাকে নিয়ে ঢাকা ফিরে আসবে বুঝেছো।’ ওর কথা শুনে আমি হাসতাম । যদিও মনের মধ্যে একটা হীনমন্যতা আমার সবসময়ই কাজ করতো। ও কতো সুন্দর, স্মার্ট, কতো সুন্দর ভাবে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে, কতো ভালো গান গায়। আর আমি!!
আমিতো কোনও ভাবেই, কোনও দিক থেকেই ওর যোগ্য নই। আমার মতে, সৌন্দর্য ব্যাপার টা আপেক্ষিক। শুধু মাত্র সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সুন্দরী চেহারা কে আর যাই হোক, যোগ্যতা বলা যায়না। এক পাতা টিপ কিনতে হলেও তো হাত পাততেই হয়। তবু কখনো সে আমায় অসম্মান বা আঘাত করে কোনো কথা বলেনা। আমি শুধু মাত্র ভাত, ডাল, মাছ-মাংস ধরনের বাংলা খাবার রাঁধতে জানি। কিন্তু ওর পছন্দ চাইনিজ। যা আমি রাঁধতে বা খেতে কোনটাই পারিনা৷ ও অনেক বার চেষ্টা করেছে, আমাকে চাইনিজ খাবার খেতে শেখানোর। প্রায়ই সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে ডিনারে গিয়েছে। কিন্তু আমিই পারিনি শিখতে। তার থেকে বড় কথা সামান্য একটু খাবারের দাম কতো বেশি! এর চেয়ে তো বরং ভালো যে আমি বাসায় ওকে অনেক কম খরচে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে রেঁধে খাওয়াতে পারি। ও আমার কথা শুনতো আর হাসতো।
আমি জানি আমি খ্যাত। তবু আমার মতো খ্যাত এবং গেঁয়ো মেয়ের কপাল যে এতো ভালো! সত্যিই আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ। এভাবে কেটে গেলো বেশ কিছু সময়। আমি শেষ পরীক্ষা দিয়ে এসে পিয়ালকে ফোন দিয়ে বললাম, বাবার সাথে পরদিন ঢাকা রওনা দিবো কিনা। ও বলল কিছুদিন পর এসে ও আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে। ওর সেই কিছুদিন পার হলো একুশ দিন পর। আমার মন ওর জন্য অস্থির হলেও চুপ করে ছিলাম। কারণ ও বলতো অফিসিয়াল প্রেশারে আছে। এরপর ও এসে আমাকে ঢাকা নিয়ে গেলো।
তিথি রায় পূজার গল্প “সিভিয়ার ক্রাশ”
এবার ঢাকা ফিরে আমি খুব অদ্ভুত এক পিয়াল কে আবিষ্কার করলাম। অল্পতেই রেগে যায়। আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এমন কি কখনো মারতেও আসে! কেন আমি কোনও জব করিনা, এক পয়সা আয় করার যোগ্যতা নেই, সংসারে নাকি আমার কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই, এসব বলতে থাকে। সবটা নীরবেই সহ্য করে নিয়েছিলাম কারণ সত্যিই তো আমি ওর অযোগ্য।
শুধু মাত্র শিক্ষকতা পেশা টাই তার পছন্দের। আমাকে বেশ কিছু জব সলিউশন বই কিনে এনে দিলো।
একদিন হুট করে আমার শাশুড়ি ফোন দিয়ে খুব কান্নাকাটি করলেন। বড় আর মেজো ছেলের বউয়ের সাথে নাকি খুব ঝগড়া হয়েছে তার। শুনে খুব কষ্ট হলো আমার। পিয়াল কে বললাম ‘মা কে ঢাকায় এনে আমাদের সাথেই রেখে দেই কি বলো? তুমি পারলে মাকে গিয়ে নিয়ে আসো।’ পিয়াল খুব খুশি হলো আমার কথায়। পরদিন বাড়িতে গিয়ে মা কে নিয়ে রাতের বাসে ঢাকা ফিরলো।
পিয়ালের খালাতো বোন মেঘা ঢাকাতেই একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে পড়ে। হোস্টেলে থাকে। ওই-ও মাঝে মাঝে আসে বাসায় বেড়াতে। সামনেই ওর আনুষ্ঠানিক বিয়ে। মানে জামাই সিয়াম লন্ডন প্রবাসী। দুই পরিবারের সম্মতিতেই ফোনে ওদের বিয়ে হয়েছে। শুধু সিয়ামের ফেরার অপেক্ষা তেই আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়ে গেছে। কয়েকমাস পর সিয়ামের দেশে ফেরার কথা। তখন অনুষ্ঠান করে সব পেপারস রেডি করতে পারলে মেঘা কেও সাথে নিয়ে যাবে। স্বামী, শাশুড়ি, ননদ নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছিলাম তখন। জব সলিউশন নিয়ে বসার সময় কই আমার! আগে সংসার পরে বাকি সব….
শাশুড়ি মা ছিলেন মাত্র দশ দিনের মতো। এরপর থেকেই বাড়িতে যাবার বায়না শুরু করলেন। শ্বশুরের কবর, উনার স্মৃতি ছাড়া উনি ঢাকায় এসে দমবন্ধ অনুভব করতেন। বারবার বলতেন এখন তার একটাই চাওয়া, স্বামীর ভিটায় মৃত্যুবরণ করতে চান।
একদিন খুব সামান্য একটা ব্যাপারে পিয়াল আমাকে গেঁয়ো খ্যাত বলে ঠাস করে গালে একটা চর বসিয়ে দিলো। তাল সামলাতে না পেরে আমি মেঝেতে পরে গেলাম। সমানে আমাকে লাথি মারতে মারতে আমার হাত পরিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। ওটাই ছিলো শুরু। ওইদিনের পর থেকে আমি কেমন যেনো ভয়ে জড়সড় হয়ে গুটিয়ে থাকতাম। ওর ভালোবাসার স্পর্শও আমার মনে ভয়ের উদ্বেগ জাগতো। অবশ্য ওই ঘটনার কিছুক্ষণ পর ও বাসায় ফিরে এসে আমাকে স্যরি বলে অনেক বার মাফ চেয়েছিলো।
সেদিনের পর থেকে সব মোটামুটি আগের মতোই আবার স্বাভাবিকই চলছিলো। তবুও আমি খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কেমন যেনো ছন্দপতন একটা ভাব চলে এসেছিলো সংসারে। এভাবে চলতে চলতে আমাদের বিয়ের এক বছর পার হলো। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলাম, শুধু এই একটা বছর নয়, সারাজীবন পিয়ালের সাথে কাটাতে চাই। আমার ধারনা পিয়াল এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী। আবার রেগে গেলে ঠিক ততোটাই ভয়ঙ্কর। তবুও এই রাগী ছেলেটাকেই আমি ভালোবাসি।
আমাদের এ্যনিভির্সারির কিছুদিন পরেই পিয়ালের জন্মদিন। পাশের বাসার ভাবির থেকে কেক বানানো শিখে নিলাম। আর ওর জন্য একটা কেক বানিয়েও ফেললাম। ওটা লুকিয়ে রেখে দিলাম রাত বারোটা এক মিনিটে ওকে সারপ্রাইজ দিবো বলে। ও ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ঠিক বারোটা এক মিনিটে ওকে ডেকে তুলে ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে, উইশ করলাম। আর বললাম ডাইনিং রুমে আসতে। ও এসে কেক দেখে বেশ খানিকটা অবাক হলো। আমি ওর হাত ধরে একসাথে কেক কাটছিলাম আর ভিডিও করছিলাম ওর ফোনে। ঠিক তখনই একটা মেসেজ এলো ‘Miss u sona, wish u all the best for upcoming future. Many many happy returns of the day….’
তিথি রায় পূজার গল্প “কোয়ারেন্টাইন ডায়েরি”
আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পিয়াল নিজেই বলল ফ্রেন্ড, এর বেশি কিছু না। যদিও শুধুমাত্র ফ্রেন্ড হয়ে ওকে সোনা ডাকলো কেন সেটা নিয়ে মনের মধ্যে খচখচানি রয়েই গেলো। ধীরে ধীরে টের পেতে শুরু করলাম, আমি রাতে ঘুমিয়ে গেলে ও বেলকনিতে গিয়ে কারো সাথে ফিসফিস করে ফোনে কথা বলে। সারাক্ষণ ফোন হাতেই থাকে ওর। আমি রান্নাঘরে থাকলে শোবার ঘরের দরজা লাগিয়েও কথা বলে। একটা সময় আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম।
এদিকে হুট করে আমারও শরীরটাও খারাপ হতে লাগলো। একটুতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি, কিছুই খেতে পারছিনা, সবকিছুতেই কেমন যেনো একটা বাজে গন্ধ পাই। শারীরিক ভাবে দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে লাগলাম। আত্মহত্যা মহাপাপ না হলে ওই পথই বেঁছে নিতাম। সেটা পারছিনা আবার নিজেকে নিজে ভালোও বাসতে পারছিনা। দিনদিন পিয়ালের বদল আর নিজের ওপর নিজের অবহেলা, সময় মতো না খাওয়া, না ঘুমানো কান্না কাটি করা, এসবেরই ফলস্বরূপ আমার অসুস্থতা।
পিয়ালের ফোন রিসিভ করা তো দূরের ব্যাপার, স্পর্শ করারও অনুমতি মেলেনি কখনো আমার৷ ইদানীং আমাদের খুব কম কথা হয়। শুধু খাবার বেড়ে ওকে বলি ‘খাবার রেডি, টেবিলে দিচ্ছি।’ ও শুধু ‘হ্যাঁ/না’ তে উত্তর দেয়।
কিন্তু এবার কেন যেনো খুব জেদ লাগলো। ওর ফোনের লক খোলার প্যাটার্ন টা আড়চোখে দেখে নিলাম। ও ওয়াশরুমে যেতেই আমি মেসেজ গুলো পড়তে লাগলাম। তাদের কনভারসেশন পড়ে মনে হলো, আমি এখনো বেঁচে আছি কেন? এর থেকে মরে গেলেই তো ভালো হতো। এইযে আমি এখন এতোটা অসুস্থ ওকে কিছুই বলিনা, এমনকি ও বোঝেওনা। খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। খুব মাথা ঘোরে, বমি পায়! তবু সব চুপচাপ সহ্য করি আমি। ও ওয়াশরুম থেকে ফেরার আগেই ফোন আগের জায়গায় রেখে দিলাম। কিন্তু কান্না যেনো কিছুতেই বাঁধ মানছেনা আমার।
আমি ওকে কখনোই কিছু না বলে সব মুখ বুজে সহ্য করে যাই। কারণ ও আমাকে এখন ডিভোর্স দিলে আমি কোন মুখে বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠবো! একে তো তাদের অভাবের সংসার। তার ওপর পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন!
মা-বাবাকে আমার জন্য কথা শুনতে হবে এটা কি করে সইবো আমি! না পারি কারোর সাথে কিছু শেয়ার করতে না পারি নিজে সহ্য করতে। শাশুড়ি প্রতিদিন ফোন করে বাচ্চা নিতে বলে। উনারও বয়স হয়েছে, ছোটো ছেলের ঘরের নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে চায়। উনার চাওয়াটাও যে স্বাভাবিক। তবুও আমি কিছুই ভাবতে পারিনা। আমার নিজেরই তো ঠাঁই নেই! এমন অনিশ্চয়তায় কিভাবে আরেকটি প্রাণ পৃথিবীতে আনবো!
এরপর হঠাৎ একদিন রাতে পিয়ালের বাসায় ফিরতে দেরী হচ্ছে। খুব টেনশনে রাত এগারোটায় ওকে ফোন দিলাম, রিসিভ করলোনা। সেদিন অনেক রাতে বাসায় ফিরলো। এবং অদ্ভুত ব্যাপার, প্রথমবার খেয়াল করলাম ও ড্রিংক করে ফিরেছে। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম ডিনার করবে কিনা! এই সামান্য কথাতেই ও আমার খোপা ধরে চুলের মুঠিতে টান দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো। এমনিতেই আমার দুর্বল শরীর। তার উপর আমার গলা টিপে ধরে রাখলো। আমি হাত দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কাশতে লাগলাম। ও হাত সরানো মাত্রই মেঝে ভাসিয়ে বমি করে ফেললাম।
ওইদিনের পর থেকে প্রায়ই নেশা করে এসে আমাকে মারধোর চালতে লাগলো। এটাও মুখ বুজেই সহ্য করে নিলাম।
একদিন ওর অফিস বন্ধ ছিলো। দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছে। তখন ওর একটা ফোন এলো। জানিনা কেন একটা দুঃসাহসের কাজ আমি করে ফেললাম। ফোন টা রিসিভ করে বসলাম। আমার হ্যালো বলা মাত্রই ওপাশ থেকে ফোন টা কেটে দিলো। ততোক্ষণে ফোনের রিংটোন শুনে পিয়ালও জেগে গেছে।
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু – দ্বিতীয় অধ্যায়”
আমার হাত থেকে ফোনটা কেরে নিয়ে চুলের মুঠি ধরে বলা শুরু করলো-
‘তোর মতো গেঁয়ো খ্যাতের জন্য আমার পুরো লাইফটা হেল হয়ে গেছে। না পারি তোকে আমার সোসাইটির কারোর কাছে পরিচয় দিতে না পারি মন থেকে তোকে মেনে নিতে। হারামজাদি অনেক চেষ্টা করেছি তোকে স্মার্ট বানানোর। তোকে চাইনিজে নিয়ে গেছি তুই চামচ দিয়ে খেতে পারিসনা। তোকে টপস জিনস আর স্টাইলিশ ড্রেস কিনে দিলে তুই পড়িসনা। বলিস তোর লজ্জা লাগে। তোকে সাজতে বললে শুধু ঠোঁটে কটকটা লাল লিপস্টিক দিস আর খোঁপা বাঁধিস। তোকে অনেকবার বারণ করা স্বত্বেও গ্রাম্য ভাষায় কথা বলার ধরন তুই ছাড়তে পারিসনা। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আর না। তোর সাথে মানিয়ে নেয়া অসম্ভব। আমাকে মুক্তি দে তুই প্লিজ!’
ততোক্ষণে ও আমার গলা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু কেনো জানিনা আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। আমার গলা থেকে ও হাত সরিয়ে নেয়া মাত্রই আমি বলে ফেললাম- ‘তাইতো আমি মুক্তি দিলে রিশিতা কে তোমার বিয়ে করতে সুবিধা হয় বুঝি? লজ্জা করেনা তোমার? ঘরে বউ রেখে রিশিতার মতো ডিভোর্সি মহিলার সাথে ঘনিষ্ঠ কথাবার্তা বলো? ছবি চালাচালি করো? এটাই তোমার শহরের স্মার্টনেস? ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের সাথে জড়ানো সভ্যতা? তোমার কি ধারণা আমি কিছুই বুঝিনা? আমি ঘুমিয়ে গেলে তুমি মাঝরাতে বেলকনিতে গিয়ে ওই মেয়ের সাথে ফিসফিসিয়ে কথা বলো। আমি বুঝিনা মনে করেছো??’ এক নিঃশ্বাসে বলে গেলাম আমি।
ও অবাক হয়ে আবার আমার চুলের মুঠি ধরে আমাকে বিছানা থেকে টেনে তুলে বলল, ‘তোর এতো বড় সাহস তুই আমার ফোন চেক করিস? খুব ভালো করেছি আমি রিশিতার সাথে প্রেম করি। ও তোর থেকে হাজার গুনে স্মার্ট, সুন্দরী, শিক্ষিতা। সবার কাছে পরিচয় দেয়ার মতো মেয়ে ও, এক কথায় পারফেক্ট এন্ড প্রেজোর্টেবল। ও তোর মতো না। জেনেই যখন গেছিস তখন বিদায় হ!’
আবার আমার মুখ ছুটে গেলো। আমিও গলা উঁচিয়ে বললাম, ‘তোমার লজ্জা করেনা একটা ডিভোর্সি মেয়ের সাথে তুমি পরকীয়া করো ছিঃ!’
ও বলল, ‘ছাত্রজীবন থেকেই রিশিতার সাথে প্রেম ছিলো। আমরা ছিলাম ক্লাসমেট। কিন্তু ওর ফ্যামিলি গরীব বলে পড়াশোনা শেষ করতে না করতেই এক ধনী ব্যবসায়ীর সাথে জোড় করে ওকে বিয়ে দিয়ে দেয়। আমি তখন ছিলাম বেকার। বিয়েতে ওর কোনো দোষ ছিলোনা। এরপর ও আমাকে ভুলতে না পেরে স্বামীর সাথেও সংসার করতে পারেনি। তাই ডিভোর্স দিয়ে চলে এসেছে। আর রিশিতার উপর রাগ করেই চাকরিতে প্রোমোশন পাওয়া মাত্রই আমিও ওকে ভুলতে বিয়ে করে আমার লাইফের সেরা ভুলটা করলাম।’
তারপর দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমি কাঁদছিলাম। নীরবতা ভেঙে ও-ই প্রথম বলল, ‘যাইহোক, তুমি যখন সব জেনে গেছো ভালোই হয়েছে, একটা কষ্ট কমলো আমার, তোমাকে জানানোর। আমাকে মাফ করো আশা। আমি তোমাকে আঘাত করতে চাইনি। আমি তো তোমাকে নিয়ে সুখী হতে এবং তোমাকেও সুখী করতে চেয়েছিলাম।’ বলতে বলতে ও নিজেও কেঁদে ফেললো। আমি ওর চোখ মুছিয়ে দিতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বারবার স্যরি বলতে লাগলো।
তিথি রায় পূজার গল্প “;রোদেলা রোদ্দুর”
এর কিছুদিন পর থেকে পিয়াল আবার আগের মতোই হিংস্র হয়ে গেলো। রোজ রাতে নেশা করে এসে আমায় মারধর করে। একদিন রাতে ড্রিংক করে বাসায় ফিরে আমার সামনেই ওই মেয়েটার সাথে ফোনে কথা বলল। বেশ খোলামেলা কথাবার্তা। আমি প্রতিবাদ করতেও ভয় পেতাম। সেসব শুনে নীরবে চোখের পানি ফেলা ছিলো আমার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সেদিন কেন জানিনা ওর মেজাজ খুব বেশিই খারাপ ছিলো। আমাকে কাঁদতে দেখেও ও রেগে গেলো। ঠাস করে গালে একটা চর দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো আমাকে। আমিও দুর্বল শরীরে তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে উপর হয়ে পরে গেলাম। আর ও আমার পেটের ওপর পা তুলে দিয়ে আজেবাজে কথা বলতে লাগলো। ব্যথায় চিৎকারও করতে পারছিলামনা আমি। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই…..
জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালে। পিয়াল আর ওর খালাতো বোন মেঘা পাশে বসে আছে। মেঘার সাথে আমার সম্পর্ক ননদ ভাবির হলেও আমরা দুজন খুব ভালো বন্ধুও বটে। আমি চোখ খুলতেই ‘ভাবি গুড নিউজ’ বলে মেঘা চিৎকার করতে থাকলো। আমি কিছুই বুঝলাম না, বোকার মতো চেয়ে রইলাম৷ পিয়াল মেঘা কে একটু বাইরে যেতে বলে আমার মুখের কাছে মুখ নামিয়ে এনে বলল, ‘আমাকে বলোনি কেন তুমি কন্সিভ করেছো? প্রথমবার বাবা হচ্ছি আর এতো বড় সুখবর টা তুমি চেপে রাখলে বোকা? পৃথিবীর সর্বোচ্চ উপহার টা তুমি আমায় দিতে চলেছো আশা। দেড়মাসের অন্তঃসত্ত্বা তুমি।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কি বলছো এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি!’
আমি মা হতে যাচ্ছি অথচ যতোটা খুশি লাগছে ঠিক ততোটাই ভয়ও লাগছে। আমার ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে জানিনা। সেখানে আরও একটি নিষ্পাপ প্রাণ পৃথিবীতে এনে কোন অনিশ্চয়তায় ফেলবো কিচ্ছু জানিনা। না আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিনা। পিয়াল যেমনই হোক, ও আমার স্বামী। আমার সন্তানের বাবা। ও আমাকে আর আমার বাচ্চাকে মেনে না নিলে আমি একাই আমার বাচ্চাকে মানুষ করবো। আমার বাচ্চার জন্য আমাকে বাঁচতে হবে, আমার বাচ্চার জন্য আমাকে ভালো থাকতে হবে।
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর পিয়াল ফোন করে সুখবরটা আমার বাবার বাড়ি, আর ওর বাড়িতে জানিয়ে দিলো। সাথে কিছু আত্মীয়স্বজনদেরও জানালো আর আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া চাইলো সকলের কাছে। বাসায় আমি সারাদিন একা থাকি বলে আমার মাকে ফোন দিয়ে পরদিনই ঢাকা আসতে বলল।
বাড়িতে আমার অসুস্থ বাবাকে একা রেখে মা ঢাকায় চলে এলো। সব বেশ ঠিকঠাক চলছিলো। পিয়াল চায় আমাদের প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। ও আমার খুব খেয়াল রাখে এখন। আমি মনেমনে হাসি আর ভাবি আমিও তো আমার বাবার রাজকন্যা ছিলাম। আমার বাবা আজ অবধি কখনোই আমার গায়ে টোকাও দেয়নি। অথচ সেই আমি তোমার মার খেয়েও তোমার সংসার করছি। আজ আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি বলে আমার এতোটা কেয়ার করছো তুমি। এটাকেই বলে নিজের আর পরের।
দিনের বেশির ভাগ সময়েই আমি আমার পেটে হাত দিয়ে অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলি। ওকে বলি, ‘তুই ছোট্ট পিয়াল বা ছোট্ট আশা যাই হোস, সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসবি। আর তোর বাবার ওপর কখনো রাগ করবিনা। ও আমার সাথে যেমনই হোক, তোর খুব ভালো বাবা বিশ্বাস কর। খুব খেয়াল রাখে তোর। তোকে নিয়ে একটু একটু করে কতো স্বপ্ন সাজায় প্রতিদিন। তোর যে কতোগুলো নাম ঠিক করে ফেলেছে জানিস না তো!’
পৃথিবীতে মাতৃত্বই যে একটা মেয়েকে স্বর্গসুখ এনে দেয় তা আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করছি। ছোটো ছোটো হাতে আমার সন্তান আমার হাত ধরে থাকবে, আমাকে মা বলে ডাকবে। ভাবতে ভাবতে প্রায়ই আমি সুখের কান্না কাঁদি।
মা প্রায় একমাস থাকার পর একদিন পাশের বাড়ির রহমান চাচা ফোন দিয়ে জানালেন, বাবার শরীর টা বেশি ভালোনা। মাকে যেনো কাল পরশুর মধ্যেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। ওইদিন রাত্রেই হঠাৎ পিয়াল আবার ড্রিংক করে বাসায় ফিরলো এবং হুট করে আমাকে মারধর শুরু করলো। আমি চেষ্টা করছিলাম না চিল্লাতে। কারণ চিৎকার করলে মা টের পেয়ে যাবে। আর সবটা বুঝতে পারলে মেনে নিতে পারবেনা। কিন্তু তবু না চিল্লালে আমার সন্তানের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এই ভেবে মা মা বলে চিৎকার করতে থাকলাম। মা এসে পিয়ালের কাছ থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নিলো।
তখন পিয়াল চিৎকার করে বলতে থাকলো ‘আপনার মেয়ে আমার লাইফটা হেল করে দিয়েছে। ওকে নিয়ে আপনি বিদায় হোন, আমি রিশিতাকে ভালোবাসি। আপনার মেয়েকে ডিভোর্স দিয়ে আমি রিশিতাকে বিয়ে করতে চাই….’
এমন পরিস্থিতিতে পরে মা পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আমার বাবা কখনোই মায়ের গায়ে হাত তোলেননি। মা- বাবা কখনো আমার গায়েও হাত তোলেননি। ছোট থেকেই খুব লক্ষ্মীমন্ত স্বভাবের মেয়ে ছিলাম বলে মা-বাবা কারোর হাতেই মার খেতে হয়নি আমায়। সেই আমি এখন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অত্যন্ত অভ্যস্তভাবেই স্বামীর মার খাচ্ছি দেখে মা খুব অবাক হয়েছেন। মায়ের অবাক ভাব দেখে আমি মাকে বললাম পাশের ঘরে চলো।
আমি আর মা পাশের ঘরে আসা মাত্রই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। আমি মাকে কিছুটা শান্ত করে বিগত সারে চৌদ্দ মাসের সব কিছু খুলে বললাম। পরের দিন মায়ের গ্রামে ফিরে যাবার কথা ছিলো। মা সেই মাঝরাতে বড় আপাকে ফোন করে বলল বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন থেকে বাবার দেখাশোনা করতে।
সেদিন সারা রাত মা কাঁদলেন। কিন্তু আমি খুব স্বাভাবিক ছিলাম। অভ্যস্ততা আর সন্তানের মঙ্গল কামনায়। মা কাঁদতে কাঁদতে আমায় বোঝালেন ‘বাচ্চাটা হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস। পুরুষ মানুষ বদলায় দুটো সময়ে। চাকরী পেলে আর বাবা হলে। পিয়ালও বাবা হলে আর বাচ্চার মুখ দেখলে ঠিক আগের মতোই হয়ে যাবে দেখবি। নিজের অস্তিত্বকে তো আর অস্বীকার করতে পারবেনা। এই সন্তানই তোদের বিয়ের আর ভালোবাসার সেতু বন্ধন হবে, মিলিয়ে নিস…..’
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই পিয়াল এসে মায়ের পা ধরে মাফ চাইলো। আমার কাছেও মাফ চাইলো। মা কিছুই বললেলনা।
শুধু বললেন, ‘আশা তো খুবই দুর্বল কিছুই খেতে পারছে না। এই অবস্থায় ওকে একা রেখে গ্রামে ফিরবোনা।’
পিয়াল খুশি হয়ে বলল, ‘তাহলে তো আরও ভালো, আপনি থাকেন মা। ওকে একা বাসায় রেখে অফিসে গেলে আমারও খুব টেনশন লাগে।’
এভাবে আরও প্রায় মাসখানেক কাটলো। আমার প্রেগন্যান্সি তখন চার পেরিয়ে পাঁচ মাসে পরেছে। বাবা আবার অসুস্থ হয়ে পরলেন। তাই মা পিয়ালকে বললেন আমাকে সহ গ্রামে ফিরতে চায়। বাচ্চা টা হয়ে যাবার পরে যেনো দুজন কে একসাথে ঢাকা নিয়ে আসে পিয়াল। কারণ আমার কাছে এসে টানা থাকার মতো কেউ ছিলোনা। আমার অসুস্থ বাবা কে রেখে তবু তো মা দুমাস রইলো। ওদিকে শাশুড়ি অসুস্থ বলে আসতে পারেননি। আর শ্বশুর গত হয়েছেন আমার বিয়ের অনেক আগেই। তাই পিয়াল আমাকে আর মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে গেলো। আমার সিক্সথ সেন্স কোনও কালেই প্রবল ছিলোনা। কিন্তু এবার ঢাকার বাসা থেকে বাইরে পা রাখতেই মনে হলো, এই বাসায় আমার আর ফেরা হবেনা……..
তিথি রায় পূজার গল্প “প্রিয়তমেষু”
গ্রামে আসার পর প্রতিদিন ফোনে আমার আর আমাদের সন্তানের খোঁজ নিতো পিয়াল। এরপর আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এলো। আমার গর্ভে পিয়াল আর আমার রাজকন্যা বেড়ে উঠছে। আমার পৃথিবী এখন শুধুই রাজকন্যাকে ঘিরে।
ধীরে ধীরে সময় গড়াতে থাকে। হঠাৎ একদিন দুপুরে আমার খুব পেট ব্যথা শুরু হয়। মা চাচীরা বলল এটা ডেলিভারি পেইন। আমাকে হাসপাতালে নেয়া হলো। পিয়ালকে ফোন করে জানানো হলো। ও তো শুনে সাথে সাথেই রওনা দিয়ে দিলো ঢাকা থেকে। রাত সারে দশটায় আমাদের রাজকন্যা পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিলো। মেয়েকে কোলে নিয়ে খুশিতে পিয়াল কেঁদে ফেলেছিলো। প্রথমবার মা হবার এবং সন্তানের মুখ দেখার অনুভূতি বর্ণনা করে বোঝানো সম্ভব নয়…..
রাজকন্যার নাম ওর বাবা রাখলো তিয়াশা। প্রায় সপ্তাহখনেক থেকে পিয়াল ঢাকা ফিরে গেলো। কোথায় যেনো পড়েছিলাম ‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই’ এই কথাটা এই একটা সপ্তাহে আমি খুব ভালো করেই বুঝলাম। প্রথম সন্তান ছেলে হবে এমন আশা করেছিলো পিয়ালের বাড়ির লোকজন। তারা কিছুটা বেজার হয়েই নাতনী দেখে ফিরে গেলো। পিয়াল প্রতি মাসে মাসে দুদিনের জন্য এসে তিয়াশা কে দেখে যায়। সব বেশ স্বাভাবিক চলছিলো। তবুও সবসময় ভয়ে থাকতাম। আমার কপাল তো, কখন যে কি হয়! কি খারাপ টা যে হয়!!
তিয়াশার বয়স যখন পাঁচমাস, আমার ভয় সত্যি প্রমাণিত করে হুট করে পিয়াল আমাকে ডিভোর্স নোটিস পাঠালো।
আমি পাগলের মতো ওর সাথে যোগাযোগ করতে এবং দেখা করতে চাইলাম। ওর সব আমি মেনে নিতে চাইলাম। মেনে নিয়েই তো ছিলাম এতোদিন। এমন কি আমি সতীনের ঘর করতেও রাজী হলাম। আমার ছোট্ট মেয়েটা যেন বাবার আদর থেকে বঞ্চিত না হয়। যেকোনো কিছুর মূল্যেই আমি আমার সংসার টা বাঁচাতে চাইলাম৷ কিন্তু না, পিয়াল কিছুতেই রাজী হলোনা। অতঃপর আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেলো…..
বাবার বাড়িতে আমি আর আমার মেয়ে বোঝা হয়ে পরে রইলাম। আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর কটু কথা শুনতে শুনতে এক সময় সব সয়ে গেলো। অনেকে বাবা মা কে আবার আমায় বিয়ে দিতে বলল।
কিন্তু আমি রাজী হইনি। পিয়াল আমার জীবন থেকে চলে গেলেও আমাকে বাঁচার একটা অবলম্বন তো দিয়ে গেছে।
শুধু কষ্ট হতো তিয়াশার জন্য। ওর তো কোনও দোষ ছিলোনা। তবু আজ ও বাবার আদর থেকে বঞ্চিত!
আগেই বলেছিলাম, আমার বাবার বাড়ি নিম্নবিত্ত পরিবার। তাই নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থার মধ্যে দিয়েই কাটাতে হতো প্রতিটা দিন। আর তিয়াশা টাও হয়েছে আমার পিছু লাগা। মা ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা মেয়েটা। ওকে সামলিয়ে এই অজপাড়াগাঁয়ে বাস করা আমি কোনও ভাবেই চাকরীর কোনও বন্দোবস্ত করতে পারলামনা। তাই ভাবলাম অর্থ উপার্জনের জন্য এমন কিছু করতে হবে যাতে ঘরে বসেই কাজ ও করা যায়, তিয়াশাকেও সামলানো যায়। আমার এগারো মাসের মেয়েটা কে নিয়ে আমি পাড়ার কিছু ছেলে মেয়েকে বাড়িতে বসে পড়ানো শুরু করলাম।
এতকাল শুধু খারাপ টাই ঘটেছে আমার সাথে তাই এতকিছুর পরে ভাগ্য হয়তো কিছুটা সুপ্রসন্ন হলো আমার ওপর। বেশ ভালোই স্টুডেন্ট বাড়তে লাগলো। ধীরে ধীরে আমি একটা কোচিং সেন্টার দিলাম। আমি সহ পাড়ার আরও দুজন কে রাখলাম টিচিং এর জন্য। এভাবে বেশ ভালোই উন্নতি হতে থাকলো। দিনগুলো আমার জন্য মোটেও সোজা ছিলোনা। গ্রাম এলাকায়, বাচ্চা মেয়ে সহ ছাব্বিশ বছরের একটা ডিভোর্সি নারীর জন্য একা বাঁচার যুদ্ধ টা যে কতোটা ভয়াবহ এবং কঠিন সেটা কারোর পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়।
তিয়াসা ধীরে ধীরে বড় হলো। গ্রামের কলেজ থেকে এইচ.এস.সি’র গণ্ডি পেরিয়ে ইউ.কে গেলো গ্র্যাজুয়েশনের জন্য। না, গল্প উপন্যাসের মতো এসব মোটেই সহজ ছিলোনা। দূর পরবাসে বসেও যেই মানুষটা দিনের পর দিন আমাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট করে গেছে, সে পিয়ালের খালাতো বোন মেঘা। বিয়ের পর বরের সাথে মেঘা লন্ডনে চলে যায়। আর ওর মাধ্যমেই তিয়াশার গ্র্যাজুয়েশনের জন্য ওখানে ওর কাছে যাওয়া।
ইউ.কে থেকে দেশে ফেরার সময় দুটো জিনিস নিয়ে ফিরলো তিয়াশা। এক. ওর গ্র্যাজুয়েশন। আর দুই. ওর পছন্দের লাইফ পার্টনার ইভান। যদিও দ্বিতীয় অর্থে ‘জিনিস’ শব্দটা যায়না তবু।
দেশে ফিরে তিয়াশা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করলো। ছোটোবেলা থেকে ওকে আমি যেই শিক্ষা টা দিয়েছি তা হলো- জীবনে যতো যাই হোক কখনো পরগাছা হয়ে যেনো না থাকে। তার বর যতোই বিত্তশালী হোক না কেন তবুও। নিজের জীবন দিয়ে আমি অন্তত এটা বুঝেছি। একটা মেয়ে যতো সুন্দরীই হোক, যতো শিক্ষিতই হোক না কেন নিজে উপার্জন না করলে শিক্ষা বা সৌন্দর্য সবটাই মূল্যহীন হয় কিছু কিছু সংসারে। আমি যেই কষ্টটা পেয়েছি জীবনে, সেই কষ্ট যেনো আমার মেয়েকে পেতে না হয়।
সত্যি কথা বলতে ইভানকে আমার পছন্দ হয়নি। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। ইউ.কে থেকে ফিরে বাবার বিজনেসের হাল ধরেছে। কিন্তু মেয়ের সুখের কথা ভেবে তাদের বিয়েতে মত দিয়ে দিলাম। তিয়াশার চাকরী পাবার পরপরই তাদের বিয়ে হয়ে যায়।
মত দিয়েছিলাম যাতে তারা ভালোবেসে দুজনে একসাথে সংসার করতে পারে। অন্য তৃতীয় কাউকে বিয়ে করলে যদি আমার মতো তাদের ঘরও ভেঙে যায় পুরনো প্রেমের সূত্র ধরে, সেই ভয়ে।
কিন্তু তবুও বিয়ের পর থেকেই তিয়াশা ইভানের অশান্তি লেগেই রইলো। প্রথমে শুরু হয়েছিলো তিয়াশার চাকরী নিয়ে। ইভান বা ওর বিত্তশালী পরিবারের কেউ চায়না তিয়াশা প্রতিদিন বাইরে গিয়ে অফিস করুক।
তাই মা হয়ে ওদের মধ্যস্থতা করতে গিয়ে সংসার বাঁচানোর জন্য চাকরী টা ছেড়েই দিতে বললাম তিয়াশাকে।
আর গোপনে নিঃশ্বাস ফেললাম। আমার সংসারে অশান্তি হতো চাকরী করিনা বলে। আর আমার মেয়ের সংসারে অশান্তি হচ্ছে ও চাকরী করে বলে!
তিয়াশাও ওর নিজের সংসারের ভালোর জন্য চাকরী টা ছেড়ে দিলো। তারপরেও কিছুই ঠিকঠাক হলোনা।
মেয়েটাও আমার মতোই, অনেক ধৈর্য্য। আর ভাগ্যও আমার মতোই খারাপ। চাকরী ছেড়ে দিয়ে নিজে বিষণ্ণতায় থাকলেও চেষ্টা করছিলো সব ঠিকঠাক করতে। অবশেষে ইভানের সাথে না পেরে একদিন চলে এলো আমার কাছে।
আর আজ ওর ডিভোর্স। এটাকেই বোধ হয় বলে, ‘হিস্টোরি রিপিট ইটসেলফ!’
আমি আমার সব আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও সতীনের সংসার করতে রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু তিয়াশা দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী নারী!
ও এসবের সাথে, নিজের সম্মানের কাছে আত্মসমর্পন করেনি। ওর মতে সম্মান যেখানে থাকেনা, ভালোবাসাও সেখানে মূল্যহীন। একজন অপরজন কে ভালো না বেসে ভালোবাসা বিহীন সংসার করার থেকে একা থাকা ভালো……
আমার জীবনে এতকিছুর পরো কিন্তু আমি কখনোই পিয়ালের খারাপ চাইনি। তবুও কি অদ্ভুত!
আমার বাবাকে আমার জন্য যেই কষ্ট টা সহ্য করতে হয়েছিলো, আজ তিয়াশার বাবা বেঁচে থাকলে তাকেও ঠিক তাই ই সহ্য করতে হতো।
হ্যাঁ, পিয়াল আর বেঁচে নেই। আমি পিয়াল কে রাগের মাথায় লাস্ট একটা কথা বলেছিলাম- ‘রিশিতা তোমার সাথে প্রেম করে তোমাকে ছেড়ে অন্য এক টাকাওয়ালা ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেছিলো। পরে তোমার টাকা হয়েছে বলে তোমার আমার সংসার ভেঙে তোমার কাছে ফিরে আসছে। যখন তোমার থেকে আরও বেশি টাকাওয়ালা কাউকে পাবে তখন তোমাকেও ছেড়ে চলে যাবে দেখবে। তুমি তখন নিঃস্ব হয়ে যাবে ভালোবাসা হীনতায়। আমি একা আমার মেয়েকে মানুষ করতে পারবো ঠিকই। কিন্তু তুমি কখনো ফিরে এলে মেয়ের ওপর দাবী করতে পারবেনা মনে রেখো…..’
আমি অভিশাপ না দিলেও প্রতিটা কথাই অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিলো। আমাকে ডিভোর্স দেয়ার কিছুদিন পর পিয়াল রিতিশাকে বিয়ে করেছিলো। কয়েক বছর সংসার করার পর রিশিতা পিয়ালের সহায় সম্পত্তি হাতিয়ে অন্য একজনের সাথে পালিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। আর লজ্জায় অপমানে পিয়াল আত্মহত্যা করে….
একটা সুইসাইড নোটে পিয়াল লিখে গেছিলো ওর কবর যেনো আমাদের বাড়ির পেছনে ওই বাঁশঝাড়ে দেয়া হয়। আমার ওপর অবিচার আর তিয়াশাকে বঞ্চিত করার জন্যই হয়তো তাকে শাস্তি পেতে হলো। তাই এটাই তার শেষ চাওয়া! বেঁচে থাকতে তো আমাদের সাথে থাকেনি তাই মরে গিয়ে হয়তো আমাদের সাথে থাকতে চেয়েছিলো…..
আজ আর তোমার ওপর আমার কোনও রাগ/অভিমান কোনটাই নেই পিয়াল। আমি আগ্রহ নিয়ে আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। যাতে পরকালে গিয়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে পারি তোমাকে। একালে তো শান্তিতে সংসার করতে পারলামনা, পরকালে সুখে শান্তিতে সংসার করতে চাই তোমার সাথে……….
পেপার’স লাইফ/গল্প/তিথি রায় পূজা

