দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুদের হামের প্রাদুর্ভাব। জ্বর ও শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে টিকা না নেওয়া এবং অসচেতনতাই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
হাম আসলে কী?
হাম কেবল সাধারণ কোনো চর্মরোগ নয়; এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা ‘মরবিলিভাইরাস’ (Morbillivirus) দ্বারা ছড়ায়। এটি মূলত মানুষের শ্বাসনালিতে আক্রমণ করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও অনেকে একে সাধারণ ‘বসন্ত’ বা ‘মায়ের দয়া’ বলে অবহেলা করেন, চিকিৎসকদের মতে এই উদাসীনতাই শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুরাই মূলত এর শিকার হচ্ছে।
কীভাবে ছড়ায়?
হামের সংক্রমণের গতি অত্যন্ত তীব্র। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত জলকণার (Droplets) মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে মিশে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুর আশেপাশে থাকা অন্য শিশু, যারা টিকা নেয়নি, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৯০ ভাগ। এমনকি আক্রান্ত শিশু ঘর থেকে চলে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর পর্যন্ত সেই ঘরের বাতাসে ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকতে পারে। এই ভয়াবহ সংক্রামক ক্ষমতার কারণেই স্কুল বা খেলার মাঠে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
হামের প্রাদুর্ভাব: লক্ষণ দেখে চেনার উপায়
হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতোই মনে হতে পারে, যা অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে। সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১২ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়:
তীব্র জ্বরের সাথে নাক দিয়ে জল পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
শুকনো কাশি এবং গলার ভেতরে অস্বস্তি।
মুখের ভেতরে গালের পাশে ছোট ছোট সাদাটে দাগ (কপ্লিক স্পট)।
জ্বর শুরুর ৩-৪ দিন পর কান ও মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়া।
শিশুর হাম হলে কী করবেন:
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই, তবে সঠিক পরিচর্যাই দ্রুত সুস্থতার চাবিকাঠি। প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা যে পরামর্শগুলো দিচ্ছেন:
বিচ্ছিন্ন রাখা: শিশুকে অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
বিশ্রাম ও পুষ্টি: প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস এবং তরল খাবার দিতে হবে। বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বারবার দুধ পান করানো জরুরি।
ভিটামিন এ: হাম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং চোখের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
জ্বর নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ দিতে হবে। তবে চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা যাবে না।
হাম মোকাবিলায় জরুরি তথ্য:
৯ মাস পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ (MR) এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিশ্চিত করুন।
শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
হাম পরবর্তী নিউমোনিয়া বা কানে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সুস্থ হওয়ার পরও কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করুন।
টিকার বিকল্প নেই
হামের এই বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, টিকাদানে বিন্দুমাত্র অবহেলা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী শিশুকে সময়মতো হামের টিকা দেওয়া হলে এই ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। আজ যে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের সুচিকিৎসা যেমন জরুরি, তেমনি ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মা তার সন্তানকে হামের কারণে না হারান, সেজন্য গণটিকাদান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

